আমি ইমো বলছি

 খাতুনে জান্নাত | বাংলা ইনিশিয়েটর

—-
ফারিয়া আকাশের আচরণে কী বলবে বুঝতে পারলো না। আকাশ আগে এরকম ছিল না। ইদানীং তার কী যেন হয়েছে। সে আগের মতো একটুও কথা বলে না ফারিয়ার সাথে। অথচ আগ বাড়িয়ে বন্ধুত্ব তো আকাশই করেছিলো! তাহলে এখন এমন করার মানে কী?আকাশ দ্রুত মেসেজ দিল- তাহলে এখন আমি কী করতে পারি? দিনরাত তোমার সাথে আড্ডা দিতে হবে?
ফরিয়া উত্তরে লিখলো- উহু। কিছুই করতে হবে না তোমাকে, আকাশ। কিছুই না। 🙂এবারে আকাশ কিছুটা ঘাবড়ে গেল।২
—-
গ্রুপ চ্যাট হচ্ছে। প্রীতমরা সব বন্ধুরা মিলে খুব মজা করছে। একেকজন যা মজার কথা লিখছে চ্যাটে, হেসে বাকী সবাই কুটিকুটি! হঠাৎ প্রীতমকে তার বন্ধু শীলা একটা মেয়ের সাথে তার ছবি দিয়ে বলল, “কিরে প্রীতম! মেয়েটা কে,হু? ইদানীং প্রায়ই দেখি ওর সাথে ঘুরে বেড়াস!”

উত্তরে প্রীতম কী বলবে বুঝতে পারলো না। এই মেয়ে কে সেই উত্তর তার পক্ষে দেয়া সম্ভব না। কী বলবে সেটা না পেয়ে সে উত্তর দিল, “🐸🐸🐸“।


—-
মুন আর রাফি খুব ভালো বন্ধু। ক্যাম্পাস তো তারা দুজন মিলে মাতিয়ে রাখেই, তার উপর সব বন্ধুদের মাঝেও তাদের দুজনের বন্ধুত্বটা একটু বেশি। যদি অন্য বন্ধুরা কখনো এটা নিয়ে মজা নেয় নি। তারা মুন আর রাফির বন্ধুত্বকে খুব ভালো ভাবেই নিয়েছে।

ফেসবুকে রাতে অনেকক্ষণ ধরে তাদের কথা হয়। একদিন মুনের একটা ছবি এডিট করে রাফি পাঠালে মুন তাকে খুশি হয়ে রিপ্লাই দেয়, “থ্যাংক য়্যূ রাফি!😍😘😘

রাফি দ্রুত উত্তর দেয়, “কিরে, তুই আমায় এই ইমো দিলি কেন?😏

মুন হঠাৎ করে কেন যেন নার্ভাস হয়ে যায়। সে তো এ ধরণের ইমো আগেও দিয়েছে। রাফি তো এভাবে প্রশ্ন করে নি!


—-
আমরা ইমো। চিনতে পেরেছো? ফেসবুকে তোমাদের মুখের ভাবভঙ্গির ত্রিমাত্রিক প্রতিচ্ছবি অন্যকে বোঝাতে ব্যবহৃত হই আমরা। বোঝাতে বললে ভুল হবে, বোঝানোর চেষ্টা করতে।

বুঝলে, মানুষ বড় আজব প্রাণী। বুঝি না তাদের কারবার। প্রথমে আমাদেরকে তৈরি করে একরকম ভাব বোঝানোর জন্য, শেষে আমাদের প্রয়োজনীয়তা চলে যায় ভিন্ন জায়গায়। এই যেমন ধরো ‘🙂‘ কে আগে কেন ব্যবহার করা হতো জানো? হাসি হিসেবেই ব্যবহৃত হতো। বেশ পরিমিত হাসি, অফিসিয়াল কোনো কাজে বেশিরভাগ এর দরকার। কিন্তু ধীরে ধীরে কী হলো আমরা নিজেরাও বুঝলাম না, বেচারার নাম হয়ে গেল ‘ফেইক স্মাইল’! যদি কারো খুব দুঃখ হয়, হাজারটা কথা দিয়েও যদি সেই দুঃখটা বোঝাতে না পারে, শুধু ফেইক স্মাইলটা দিয়ে দেয়। ব্যাস, শুরু হয় ধামাকা। যাকে দেয় সে যায় ঘাবড়ে! এই ইমোর মানে এখন অনেকটা এরকম, “আমি খুব কষ্টে আছি। তুমি নিজে নিজে বুঝে নাও”।
আজব চিড়িয়া মানুষ! যত্তসব!

ইদানীং আবার দেখছি আমাদের ব্যাঙকে নিয়ে খুব টানাটানি লাগিয়েছে মানুষজন। কেউ কেউ তো নাকি জানেই না সে কথায় কথায় ব্যাঙ কেন দেয়! কিন্তু দেয়। দিতেই থাকে। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম,
“ভাই, কেমন আছেন?”
“ভালো 🐸
“ভাত খেয়েছেন?”
“হ্যাঁ। 🐸
“কী দিয়ে?”
🐸
“ব্যাঙ ভাজি নাকি?😐
“আরে না না, ব্যাঙ ভাজি কেন হবে! আইটেম খুব খারাপ রে ভাই। বলতে চাচ্ছি না। তাই ব্যাঙ দিলাম।”
“অহ। কী জন্য ব্যাঙ দেন ক্যামনে বুঝব? সব কথায়ই তো দেন!”
🐸

এই হলো মানুষের অবস্থা। মানে কী যে করে সে নিজেও জানে না! শুধু কী এই! কাউকে ভালোবাসে, কিন্তু প্রপোজ করতে ভয় পাচ্ছে, এমন ছেলে-মেয়ে দেখলেই আমরা চিনে যাই! তারা চ্যাট কনভারসেশনে ইমোজি সেট করে, ‘❤️‘। এই ইমোজিতে আবার ভালোবাসা উড়ে উড়ে যায়। এসব ছেলে-মেয়ে পছন্দের মানুষের সব স্ট্যাটাস এবং ছবিতে লাভ রিয়েক্ট দেয়। দেখা যাবে লাভ দিতে দিতে তার এমন অবস্থা যে পছন্দের মানুষ রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস দিয়ে দিল, সে শুধু নাম দেখে চোখ বন্ধ করে লাভ দিয়ে দেখবে এই অবস্থা! তার মাথা উঠবে চক্কর দিয়ে!

কয়েকজন তো দেখি সব কিছুতেই ‘হাহা’ দিয়ে বেড়াচ্ছে! নিউজফিডে ঢোকে আর ঝড়ের বেগে সব স্ট্যাটাসে হাহা দিয়ে যায়। তাদের হাহা দেয়ার সংগ্রাম চলতেই থাকে। পড়েও দেখে না কিসে হাহা দিচ্ছে। হয়তো কেউ লিখেছে, “আজ দুপুর ১২ টায় আমার মামা চলে গেল। খুব মন খারাপ লাগছে। তুমি এমন কেন করলে মামা?” সেখানেও সে হাহা দিয়ে বসলো! অতঃপর খেলো ব্লক!

মানুষের এই অবস্থা দেখে যে কী করব বুঝতে পারছি না। খুবই হাসি আসছে। যদি আমরা মানুষ হতাম, তবে অবশ্যই ‘😂‘ এই ইমো দিতাম তাদের উদ্দেশ্যে। তাদের ভাষায়ই তাদের বলতাম, “বুঝলি ব্যাটা, তুই একটা আস্ত লল!” কিন্তু আফসোস! বলতে পারলাম না! উল্টো আমাদেরকে ব্যবহার করে তারা অন্যদের এটা বলে!

শুনেছিলাম মানুষ নাকি বড্ড আবেগের প্রাণী। তাদের ভালোবাসা বড় তীব্র। কিন্তু এখন আমাদের মোটেও তা মনে হচ্ছে না। যে একটা ত্রিমাত্রিক প্রতিচ্ছবি ব্যবহার না করে নিজের ভালোবাসাটা প্রকাশ না করতে পারে, তাকে এই খেতাব দেয়ার কোনো মানে হয় না। যেই ছেলেটা ভার্চুয়াল এই জগতে হাজার হাজার ‘লাভ’ ইমো ব্যবহার করে শত শত মেয়ের সাথে এক নাগাড়ে ভালোবাসার কথা বলেছে, সে কি জানে যখন সত্যিকারের ভালোবাসার মানুষ সামনে থাকে তখন কী বলতে হয়?

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।