প্রচ্ছদ » সাইন্স ভিউ » বিজ্ঞান ফিচার » নক্ষত্রদের জন্মের ইতিহাস (২য় পর্ব)

নক্ষত্রদের জন্মের ইতিহাস (২য় পর্ব)

 আবদুল্লাহ আল মামুন | বাংলা ইনিশিয়েটর

প্রথম পর্বের পর থেকে শুরু ……

লোডশেডিং তাই মোমবাতি জ্বালিয়ে বসেছি! ফিরে এলাম নক্ষত্রদের জীবনের গল্প বলতে।

মোমের সুতোর পোড়া জায়গাটা মূলত কার্বণের। পোড়া অংশ কেটে কেটে একসময় আমরা পেয়ে যাবো কার্বন যার পরমাণুর কেন্দ্রে ৬ টা প্রোটন আর ৬ টা নিউট্রন সাথে এদের ঘিরে থাকা ইলেকট্রন মেঘে রয়েছে ৬টা ইলেকট্রন।

আগেই বলেছি ইলেকট্রন আর প্রোটন সংখ্যা সবসময় সমান। আমি যদি এ পরমাণু হতে দুটো প্রোটন দুটো নিউট্রন আলাদা করে আনি। আলাদা অংশটা আর কার্বন হিসেবে থাকবেনা। হয়ে যাবে হিলিয়াম। এই যে পরমাণুরে বিভক্ত করে নতূন পরমাণু সৃষ্টি এর গাল ভরা নাম হলো “নিউক্লিয়ার” ফিশন বা নিউক্লিয়ার বিভাজন। এ ফিশন গুলো করা হয় পারমানবিক অস্ত্র এবং নিউক্লিয়ার শক্তি প্ল্যান্ট গুলোতে! তবে সেখানে কার্বনের মত এত কম প্রোটন নিউট্রনের পরমাণুকে ব্যবহার করা হয়না। অনেক ভারী (ইউরেনিয়াম-২৩৫/২৩৭) পরমাণুকেই ফিশন বা বিভাজিত করে আমরা শক্তি পেতে পারি, যা আসে নিউক্লিয়াসকে ভাঙ্গার কারণে।

আরো গভীর ভাবে দেখি। আগেই জেনেছি যে পরমাণু দিয়ে অণু এবং অণু দিয়ে সব সৃষ্টি।

সে পরমাণুও মৌলিক কণা না। আমরা পেয়ে যাই পরমাণুর কেন্দ্রে প্রোটন নিউট্রন আর মেঘাচ্ছন্ন করে ঘিরে থাকা ইলেকট্রন। কিন্ত কোনো ভাবে যদি আমি দুটো প্রোটনের মাঝে বা নিউট্রনের মাঝে ধাক্কাধাক্কি শুরু করাই দেখবো যে প্রোটন নিউট্রনও কোয়ার্ক নামে আরো মৌলিকতর কণা দ্বারা তৈরী হয়। যাদের আছে বর্ন ও গুণ! ( ৬ ধরনের কোয়ার্ক আছে, দু ধরনের কোয়ার্কের সম্বনয়ে প্রোটন নিউট্রন সৃষ্টি)

তবে কোয়ার্ক গুলোকে আলাদা পর্যবেক্ষণ করা কঠিন, স্বাধীন অস্তিত্ব ওদের নাই। তারা একে অপরের সাথে বেশ শক্তিশালী বন্ধনে আবদ্ধ রয়। যাইহোক এদের বৈশিষ্ট্য গুলো নিউক্লিয়াস জগৎকে আরো স্পষ্ট ব্যাখা করে আমাদের কাছে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় এই মৌলিক হতে মৌলিক কণার সন্ধানের কি শেষ হবে? আমরা কি পাবো সন্ধান, সর্বোচ্চ মৌলিক কণার।

উত্তরটা আছে স্ট্রিং থিওরির কাছে। যা নিয়ে অন্য এক সময়ে কথা হবে।

কণা গুলোর ট্রান্সফর্মেশন নিয়ে সবসময় মানুষের আগ্রহ ছিলো। আলকেমি নামে এক গবেষক দল যারা মধ্যযুগের মানুষ। তারা পানি বায়ু মাটি এবং আগুন কে সব পদার্থের মৌলিক উপাদান ভাবতো। তারা ভাবতো এ চারটা এর মিশ্রনে চারপাশের জগৎটা সৃষ্টি।

এ ধারনাটা খুব খুব পুরোনো প্রাচীন আয়োনীয়নরা এমন ভাবতো। গ্রীক উপনিবেশ আয়োনীয়াতে ওদের বসবাস ছিলো। তাদের বিজ্ঞানের নীতি ছিলো মৌলিক সূত্রাবলী দ্বারা প্রকৃতিকে ব্যাখা করা। তাদের পদ্ধতি লজিক বেইজ ছিলো। তাদের অনেক মহা আবিস্কার যা শতাব্দী স্রোতে বিলুপ্ত হলেও পরে পুনরায় আবিস্কৃত হয়।

চিত্রে : Arturas Slapsys এর ছোয়াঁয় আল কেমিস্ট

আমরা আলকেমিদের কথায় ফিরি। তারা ভাবতো মাটি আর আগুনের আপেক্ষিক অনুপাত পরিবর্তন করে তামাকে কে সোনা বানানো যাবে। সেসময় অনেক প্রতারক ছিলো, তারা দাবী করতো সোনা হতে তামার রুপান্তর তারা জানে, অমরতার কৌশল জানে।

এসব ভন্ডরা বিজ্ঞানী বা আল-কেমিস্টেদের লেবাস পরে বহু টাকা হাতিয়ে নিলো রাজা-বাদশাহদের হতে। রাজাদের অভিজাত্য-অমরতার লোভ কে কাজে লাগিয়ে তারা হচ্ছিলো ধনী। আল-কেমি দের দলে ছিলো নিউটন প্যারাসেলসাসের মত বহু বিখ্যাত বিজ্ঞানী। তবে যা ই হোক রাজাদের ওদের পেছনে অর্থ ব্যয়ে পুরা অপচয় হয়নাই, ফসফরাস, মার্কারির মত নতুন মৌল আবিস্কার হতে লাগলো!

মৌল হলো প্রাকৃতিক সেই ৯২টি পরমাণু। আমাদের গ্রহে এদের বিভিন্ন অণুতে সমন্বিত অবস্থায় পাই। যেমন পানি ২টা হাইড্রোজেন আর ১টা অক্সিজেনের বন্ধুত্ব বা বন্ধন বা বন্ডে তৈরী।

তাহলে নতূন ধারনা অনুসারে তারা যে চারটা উপাদানের কথা বলতো পানি যা কয়েকটা অণুর তৈরী,মাটি-বায়ু যারা নানা ধরনের তৈরী। আর আগুন? এটা কেবল উত্তেজীত ইলেকট্রনগুলোর বাহ্যিক রুপ। বুঝিয়ে বলি, যখন আমি মোমবাতি জ্বালাচ্ছি মোমের আর মোমের সুতোর মাঝে অক্সিজেন সংযোজনে জ্বলে তাদের শেষ কক্ষপথের ইলেকট্রন গুলি জায়গা অদলবদল শুরু করে ব্যস তখন শক্তি বিকরন হয়। আর সে শক্তি আমরা আলো ও তাপ রুপে পাই! এই যে ইলেকট্রনেরা উত্তেজিত হচ্ছে এ অবস্থা প্লাজমা অবস্থা। যে অবস্থা তে ইলেকট্রন গুলি কেন্দ্র হতে সরে যায়!

প্রোটনে চার্জ পজিটিভ ধরে নিলে, ইলেকট্রন নেগেটিভ আর নিউট্রন যার নাম থেকে বুঝি এটা নিউট্রাল বা নিরপেক্ষ! প্রোটন-ইলেকট্রন সমান থাকে বলেই পরমাণু চার্জহীন হয়। প্রোটন ইলেকট্রনের আকর্ষনই পরমাণুর অস্তিত্বের কারণ।

পরমাণুর রসায়ন কেবল সংখ্যা নির্ভর?!!! বলি কিভাবে! পরমাণুর যদি ১টা প্রোটন থাকে সে হাইড্রোজেন। দুটো হলে হিলিয়াম এমন করে ৯২টি প্রোটনযুক্ত নিউক্লিয়াস হলে ইউরেনিয়াম। মনে রাখা ভালো প্রোটন বাড়ার সাথে সাথে কিন্তু তার বাইরে ইলেকট্রনের মেঘে ইলেকট্রনও সমান সংখ্যক বাড়ছে।

রসায়ন তাহলে সংখ্যান নির্ভর। এমন ধারনা দেখে পিথাগোরাস নিশ্চয় খুশি হতেন। কারন তার মন বলতো সবকিছু এমন কি স্বর্গ-মর্ত্য-নরক সব সংখ্যা মেনে চলে।

একবার ভাবুন তো স্রেফ সংখ্যা বদলে, প্রোটনের সংখ্যা বদলে আপনি স্বর্ণকেও তামা বানাতে পারেন আবার তামাকে স্বর্ণ! এমন হয়েছে কিনা জানিনা  তবে এমনটাই চাইতো আলকেমিরা। যা তাদের পক্ষে করা অসম্ভব।

সমজাতীয় চার্জ কাছাকাছি থাকলে বিকর্ষণ করে বলে জানি!

ইলেকট্রন না হয় পাউলির বর্জন নীতি মেনে প্রোটন-নিউট্রন কে ঘিরে ঘুরছে তাই তাদের একসাথে থাকা লাগছেনা, কিন্তু প্রোটন? সে কিভাবে আবদ্ধ আছে নিরপেক্ষ নিউট্রন আর স্বজাতি প্রোটনের সাথে!

খুব সাধারণ একটা কারন তারা পরস্পর একটা বলের কারনে আকর্ষন করে কাছাকাছি থাকে। এ বল তখন কাজ করে যখন দুটো প্রোটন ও নিউট্রনরা খুব কাছাকাছি চলে আসে। একটা রেঞ্জ আছে। রেঞ্জ এর বাইরে গেল কিন্তু আর এ বল থাকেনা। বলটার নাম নিউক্লিয়ার বল।

আরও পড়ুনঃ নক্ষত্রদের জন্মের ইতিহাস (১ম পর্ব)

আমরা যত প্রোটন নিউট্রন যোগ করি ততই হাইড্রোজেন হতে সেটা বেড়ে ইউরিনিয়াম অব্দী থামে। অর্থ্যৎ ৯২ টা প্রোটন থাকা পরমাণু প্রকৃতিতে আছে। তবে আমরা জোর করে বাড়িয়ে নতুন মৌল বানাই।

মানুষের তৈরী পরমাণু গুলা স্থায়ি না। ভেঙ্গে অন্য সাধারণ মৌলে রুপ নেয় যেমন প্লুটনিয়াম যা সবচে বিষাক্ত বলে জানা যায়! মোট ১১৩ টার মত পরমাণু এখন আবিস্কৃত!

কিন্তু কথা হলো প্রাকৃতিক এ পরমাণু গুলো কি করে সৃষ্টি হয়? বিগ ব্যাং এর পর এখনো মহাবিশ্ব এর সর্বত্রে আছে হাইড্রোজেন আর হিলিয়ামের প্রাচুর্যতা।

তবে কি বাকি ৯০টা পরমাণু হিলিয়াম হাইড্রোজেন হতে এলো?
আমরা জানি প্রোটন নিউট্রনের তড়িৎ বলের জন্য পরমাণু তৈরি কিন্তু প্রোটন প্রোটনে যুক্ত হয়ে যত বেশি ভারী নিউক্লিয়াস বানানো যাবে তত বেশি ইলেকট্রন পেয়ে নতুন নতুন পরমাণু তৈরী হবে। তবে এমনটা তখনি সম্ভব যদি কণা গুলো উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে থাকে ( মিলিয়ন মিলিয়ন ডিগ্রী!)।

তারা তখন এতই ছোটাছুটি করে এবং পরস্পর খুব সন্নিকটে রয় যে বিকর্ষন তড়িৎ বলের ক্রিয়া করার সময় হয়না, প্রোটন নিউট্রন গুলি পরস্পর খুব কাছে আসে। তখনি উদ্ভব হয় নিউক্লিয়ার বল। এবং তৈরী হয় নানা পরমাণু।

এমন উচ্চ চাপ ও তাপ কেবল নক্ষত্র গুলিতেই সম্ভব! এবং তাই ই হয়েছে, আগামী পর্বে জানা হবে পুরো প্রক্রিয়াটিই!

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।