প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » অতিথি কলাম » জাতির পিতা কে? হযরত ইব্রাহীম (আ) নাকি শেখ মুজিবর রহমান?

জাতির পিতা কে? হযরত ইব্রাহীম (আ) নাকি শেখ মুজিবর রহমান?

বিডি রায়হান

বিডি রায়হান

একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠী ও স্বাধীনতা বিরোধী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের আপামর সাধারণ জনগণের মাঝে  “জাতির পিতা” ইস্যু নিয়ে প্রায়শই বিভ্রান্তি ছড়ায়। বিশেষভাবে, শোক দিবসকে কেন্দ্র করে বিকৃত ইতিহাস রচনায় তৎপর হয়ে উঠে। জনমানুষের মধ্যে প্রশ্নটা থেকেই যায় জাতির পিতা কে? হযরত ইবরাহীম (আ) ?নাকি শেখ মুজিবর রহমান?

প্রথমে, আমাদের জানতে হবে জাতি কি?
জাতি এক ধরণের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্প্রদায়। জাতিবোধ একটি নৈতিক এবং দার্শনিক চেতনা যা জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটায়। জাতি বলতে কোন একক অংশকে বুঝায় না। জাতির বহুরূপতা আছে । যেমনঃ দেশ জাতি, ভাষা জাতি, ধর্ম জাতি, বর্ণ জাতি, গোত্র জাতি, প্রভৃতি।

প্রতিটি মানুষ একই সাথে বহুজাতির মধ্যে অর্ন্তভুক্ত। যেমনঃ আমি দেশ জাতি হিসেবে একজন বাংলাদেশি, ভাষা জাতি হিসেবে একজন বাঙ্গালি, ধর্ম জাতি হিসেবে একজন মুসলিম/হিন্দু, বর্ণ জাতি হিসেবে একজন শ্বেতাঙ্গ/ কৃষ্ণাঙ্গ ইত্যাদি।

দ্বিতীয়ত, আমাদের জানতে হবে জাতির পিতা কাকে বলা হয়?
জাতির জনক/পিতা হল কোন ব্যক্তিকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য দেওয়া একটি উপাধি যিনি কোন দেশ, রাষ্ট্র বা জাতি প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতা অর্জনের পিছনে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। অর্থাৎ, এখানে স্পষ্ট যে জাতির পিতা উপাধি কেউ নিজে থেকে নামের সাথে সংযুক্ত করে না, যারা দেশের স্থপতি হয়, বহু সংগ্রাম, ত্যাগ তিতিক্ষার রাজনীতি, আন্দোলন করে স্বাধীনতা এনে দেয় তাদেরকে দেশের আপামর জনসাধারণ ভালবেসে উপাধি দেয়।

ঠিক এই কারণেই তৎকালীন স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক ও বর্তমান জাসদের নেতা আ.স.ম আবদুর রব ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে “জাতির জনক” উপাধি প্রদান করেন।

বিভাজিত জাতির মধ্যে যেই অংশে যে নেতার অবদান সে অংশে বা গন্ডিতে তিনিই জাতির পিতা। সে ক্ষেত্রে কেউ কারো স্ব স্ব অবস্থান ছেড়ে অন্যের অবস্থান কেড়ে নিতে যাওয়া বা ধর্ম ও জাতীয়তার মাঝে মিশ্রণ ঘটিয়ে মিথ্যা অপপ্রচার চালানো শুধু মাত্র নির্বুদ্ধিতা নয় অপরাধের ও শামিল।

যেহেতু, আমি একজন মুসলিম তাই এই গন্ডিতে আমার জাতির পিতা ইবরাহীম (আ)। আবার পাশাপাশি আমি একজন বাঙালী, এই গন্ডিতে আমার জাতির পিতা শেখ মুজিবর রহমান।

একজন মুসলিম হিসেবে কোন দ্বিধা দ্বন্দে না যেয়ে বলে যেতে পারি সমগ্র মুসলিম দোজাহানের জাতির পিতা ইবরাহীম (আ)। কিন্তু একজন বাঙালী হিসেবে সমগ্র বাংলাদেশীদের জাতির পিতা শেখ মুজিবর রহমান এটা মানতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে হবে কেন?
শুধুমাত্র স্বাধীনতা বিরোধী পাকি প্রেমীদের-ই মানতে কষ্ট হবে। কোন সত্যিকারের মুসলিম বা কোন বাঙালী চোখ বুজে এই মহৎ সত্য স্বীকার করে নেবে।

তথাকথিত ধর্ম এবং রাজনীতি ব্যবসায়ী তাদের সেই পাকিপ্রেম অন্য মানুষদের মাঝে ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টায়রত। তারা মুসলমানদের জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রসঙ্গ এর মাঝে টেনে এনে মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করে থাকে।

এবার মূল প্রসঙ্গে যাই, তূরস্কের জাতির পিতা হচ্ছে কামাল আতাতুর্ক, ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী, পাকিস্তানের জাতির পিতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্, আফগানিস্তান এর জাতির পিতা দুররানি, ইরানের জাতির পিতা সাইরাস দ্য গ্রেট, মালয়শিয়ার জাতির পিতা টুংকু আবদুল রহমান, বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। এমনকি শতভাগ মুসলিম পরিপূর্ণ দেশ সৌদি আরবের জাতির জনক আব্দ আল আজিজ ইবনে সাউদ।

খুব ভাল ভাবে লক্ষ করুন। উপরোক্ত মুসলিম দেশগুলোতে ও কিন্তু জাতির পিতা আছে। তারা মনে প্রাণে তাদের স্ব স্ব জাতির পিতাদের মান্য করে তবে কি তারা এই জন্যে মুসলিম নয়? তারা কি পবিত্র ধর্ম গ্রন্থ আল কোরআনের কথা মান্য করে নি? অবশ্যই মান্য করেছে। তারা জাতির মাঝে ভেদাভেদ উপলব্ধি করতে পেরেছে, জাতিভেদে জাতির পিতার স্ব স্ব অবস্থানের মর্যাদা দিয়েছে।

শুধুমাত্র আমাদের দেশেই “বাশের কেল্লার ” মত নিম্নমানের, শঠতা, ভন্ডামি, ধর্ম ব্যবসায় জড়িত, প্রচন্ড সাম্প্রদায়িক একটা ফেসবুক পেজের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো কথা গুলো বিশ্বাস করে মহান আত্মত্যাগের কাণ্ডারি, স্বাধীনতার স্থপতিকে স্বীকৃতি দেওয়া থেকে বিরত থেকে যায় একদল গোষ্ঠী।

সবচেয়ে মজার বিষয়টি হচ্ছে, পাকিপন্থী সমর্থকরা শেখ মুজিবর রহমানকে ধর্মের দোহাই দিয়ে জাতির পিতা না মানলেও জিন্নাহকে ঠিকই মনেপ্রাণে জাতির পিতা হিসেবে মেনে নেয়। এর কারণ ও আমাদের সবার অজানা নয়। খুবই পরিষ্কার বিষয়, তাই নতুন করে কিছুই বলার নেই। আসল কথা যারা পাকিস্থানের জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করে তারাই মুলত জাতির পিতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করে ইসলাম এবং আমাদের মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহীম (আ) সাথে বঙ্গবন্ধুকে তুলনা করে ধর্মব্যাবসার মাধ্যমে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করার অপচেষ্টা চালিয়ে যায়।

আরেকটি দুঃখের বিষয় হচ্ছে, অনেকেই ব্যঙ্গ করে বলে, মুজিব কি আমার পিতা নাকি? তাকে পিতা বলতে হবে কেন? সে তো আমার জন্মদাতা পিতা নয়, তাকে পিতা বলা হারাম!

আচ্ছা, তবে ইব্রাহীম (আ) কি সমগ্র মুসলিমের জন্মদাতা পিতা? (নাউজুবিল্লাহ) অবশ্যই নয়। ইব্রাহীম (আ) কে যখন মুসলিম জাতির পিতা বলা হয়, তখন সেটা কি হারাম? অবশ্যই নয়। জাতির পিতা স্ব স্ব জাতির স্থপতিদের একটা উপাধি মাত্র। এটা অনুভবের বিষয়, হ্নদয় দিয়ে উপলব্ধি করার বিষয়, চেতনা জাগ্রত করে বুকে ধারণ করার বিষয়।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মানে এই নয় যে বঙ্গবন্ধু আমাদের জন্মদাতা পিতা, বরং তিনি সেই স্বাধীন ভূমির জন্মদাতা যেখানে আমরা বাঙালি জাতির একটি অংশ হিসেবে জন্মেছি। শুধুমাত্র বোকার স্বর্গে বাস করা মূর্খ ব্যক্তিরাই জন্মদাতা পিতা ও জাতির পিতার মাঝে সংমিশ্রণ ঘটাবে।

পরিশেষে বলতে চাই, আপনি যেই রাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যক্তিই হোন না কেনো, আপনি ছাত্রলীগকে তাদের অপকর্মের জন্যে নিন্দা করতে পারেন, যুবলীগের মন্দ কাজের জন্যে দোষারোপ করতে পারেন, আওয়ামীলীগের কঠোর সমালোচনা করতে পারেন কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোন ব্যঙ্গ বা কটাক্ষ করার পূর্বে আপনাকে সহস্রবার ভাবতে হবে।

একটি দেশের স্বাধীনতা আপনি আপনি এসে যায় নি, এক তর্জনীর ইশারায় হুট করেই লক্ষাধিক মানুষ যুদ্ধে ঝাপিয়ে পরে নি, একজন মহানায়ককে বন্ধী রেখেও পাকবাহিনী মারতে পারে নি। জাতির পিতা হওয়া কি এতোই সহজ?

এর পিছনে রয়েছে ত্যাগের রাজনীতি, দীর্ঘ বাইশ বছর ক্রমে ক্রমে জেলে কারাবরণ, বাংলার মানুষের প্রতি ভালবাসা, অদম্য দেশপ্রেম, সাহসী ও সংগ্রামী মনোভাব, অপরিমেয় বুদ্ধিমত্তা। তাই জাতির স্থপতিকে নিয়ে মিথ্যা শব্দ উচ্চারিত করার পূর্বে বঙ্গবন্ধুকে পড়ুন, জানুন, উপলব্ধি করুন; জাতির পিতার স্বীকৃতি শুধু মুখে নয়, হ্নদয়ের পিঞ্জরে আপনা আপনি একটি নাম লিপিবদ্ধ হয়ে যাবে; যেই নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান।

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ইনিশিয়েটর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ইনিশিয়েটর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না
>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।