প্রচ্ছদ » ছবিওয়ালা » হায়েনার সাথে যখন মানুষের বন্ধুত্ব !!

হায়েনার সাথে যখন মানুষের বন্ধুত্ব !!

 ফাতিহা অরমিন নাসের | বাংলা ইনিশিয়েটর

বিশ্বের সবথেকে ভয়াবহ আর হিংস্র প্রাণীর তালিকায় হায়েনার স্থান প্রথম হলেও ইথিওপিয়ার এই ছোট্ট গ্রামে, হায়েনা মানব নামে পরিচিত তরুণ আব্বাস এই বুনো প্রাণীদের এতটাই অসীম মমতায় পোষ মানিয়েছেন যে, তাদের তিনি বাড়িতে বসে নিজ হাতে খাইয়ে দেন, ঠিক যেন পিতা মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছেন সন্তানকে ! ছবিঃ BRIAN LEHMANN

দেয়ালঘেরা হারার নগরীতে তখন গোধুলিবেলা। আবছায়াতে এক তরুণকে ধরাশায়ী করে দিয়ে উল্লসিত হাসি হেসে চলেছে পাঁচ হায়েনার এক দল,গায়ে হিম ধরিয়ে দেয়া সেই হাসি চুরমার করে দিচ্ছে চারিদিকের নরম নিস্তব্ধতাকে। তাদের তীক্ষ্ণ লোভী দাঁত আর বাদুড়ের মতো ঝটপট করতে থাকা কান জানান দিচ্ছে, হ্যা এখনই। এখনই সময় হয়েছে খাবার।

হায়েনাদের থেকে সবাই দূরে থাকতে চাইলেও ব্যতিক্রম ইথিওপিয়ার হারার শহরের যুবক আব্বাস। হায়েনাদের সাথে তার সম্পর্ক এতটাই অন্তরঙ্গ যে বাড়ির আঙিনায় বসে তাদের মুখে খাবার তুলে দেন তিনি। ছবিঃ BRIAN LEHMANN

হায়েনা মানব নামে পরিচিত এই তরুণ আব্বাস ইউসুফ এমন বুনো আর হিংস্র প্রাণীদের পোষ মানানোর উপায় শিখেছিলেন তার বাবা ইউসুফ মুম সালেহ এর কাছ থেকে। কয়েক বছর পেরোতেই, ‌এ ঐতিহ্যকে খুঁজে নেয় পর্যটকদের আগ্রহী চোখ;  একই সাথে আরো এক ধাপ অন্তরঙ্গ হয় বুনো হায়েনা আর সভ্য মানুষের মধ্যকার এই ভালোবাসা।

দিনের প্রথম পেটপূজাটা হায়েনারা করে শহরের ময়লা ফেলার স্থানটিতে ; এ যেন আব্বাসের পক্ষ থেকে তাদের জন্য কোন এক রাজকীয় উপহার ! আর রাতের বেলায় তাদের নিমন্ত্রণ পড়ে আব্বাসের বাড়িতে। বাড়ির সামনে আব্বাস আসর পেতে বসেন বুনো জন্তুগুলোকে নিয়ে, চলে জমিয়ে নৈশভোজ। ছবিঃ BRIAN LEHMANN

 

এই অভূতপূর্ব সম্পর্ককে ক্যামেরাবন্দী করবার উদ্দেশ্যে ছুটে চলা আলোকচিত্রী ব্রায়ান লেম্যানকে বিস্মিত করেছিল সম্পর্কের গভীরতা আর অপার্থিবতা। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে নিজের অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ইথিওপিয়ার এই ছোট্ট শহর বাদে সারা বিশ্বেই মানুষজন হায়েনাদের নিয়ে ভীত, কেননা, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে চিবিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া তাদের কাছে বাঁ হাতের খেলা ছাড়া কিছুই নয়। এই শহর থেকেই খানিক মাইল দূরে এক তরুণীকে কামড়ে নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে হায়েনারা তাদের নৃশংসতার নমুনা তুলে ধরলেও এ শহরের মানুষদের কাছে নেড়ি কুকুরের মতই স্বাভাবিক।

হায়েনার ডেরার আশেপাশে যাবার কথা শুনে অনেকের আত্মা কেঁপে উঠলেও হায়েনা মানব নামে পরিচিত আব্বাস ইউসুফের ব্যাপারটা একটু ভিন্ন। হায়েনার ডেরার সামনে, খোদ হায়েনাকে নিয়ে বসে থাকাটা তার কাছে বেশ উপভোগ্য। এই বুনো প্রাণীদের খাইয়ে দাইয়ে আর ভালোবাসায় পোষ মানাবার অসাধারণ এ পদ্ধতি তিনি রপ্ত করেছিলেন তার বাবার কাছ থেকে। ছবিঃ BRIAN LEHMANN

এই শহরের রয়েছে শতাব্দীভর হিংস্র এই‌ জন্তুদের সাথে বন্ধুত্ব পাতিয়ে চলার এক অসাধারণ ইতিহাস। সেই ইতিহাসের গভীরে গিয়ে দেখা যায়, কয়েক শতাব্দী আগেও কোন চিহ্নই ছিলোনা এমন বন্ধুত্বের। তখন অন্য শহরের মতই এখানেও হায়েনারা আক্রমণ করতো মানুষদের। সমাধান হিসেবে নগরবাসী চালু করে অন্যরকম এক নিয়ম। প্রতিদিন দু’বেলা করে হায়েনাদের খাবার দেয়ার এই বুদ্ধি কাজে দিয়েছিল আশানুরূপভাবেই। যার ফলাফল – বিগত দুশো বছরে একজন মানুষকেও হায়েনার খাবার হতে হয়নি !

আরও পড়ুনঃ আফ্রিকার অবিশ্বাস্য প্রাকৃতিক বিস্ময় দেখলে অবাক হবেন

প্রতিদিন সকালে পুবদিকে সূর্য ওঠার এত নিয়ম করেই হায়েনারা নাস্তা করতে ময়লার গাড়ির পাশে। আবার ঠিক সন্ধ্যেবেলায় উল্লসিত হাসি হেসে তারা ইউসুফকে আহ্বান জানায় রাতের খাবারের জন্য।

শহরতলীতে চোরের উপদ্রব কমানোর জন্য টহল পুলিশের পাহারা নতুন কিছু নয়। কিন্তু দেয়ালঘেরা মধ্যযূগীয় এ শহরে পুলিশের পাশাপাশি খোদ হায়েনারাও দায়িত্ব নিয়েছে নগরবাসীকে নিরাপদে রাখার। তাদের চলাফেরা আর টহল দেখে বিশ্বাস হতে চাইবেনা যে এরা বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাণীগুলোর একটি। মনে হবে, আরে এ তো শহরের অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়ানো নেড়ি কুকুর ! ছবিঃ BRIAN LEHMANN

ট্যুরিস্টদের কাছে আকর্ষণীয় এ দৃশ্যের বর্ণনা দিয়ে লেম্যান বলেন, প্রতি সন্ধ্যায় পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে নাম ধরে ডেকে ডেকে আব্বাস তার বাড়িতে রাতের খাবারের আমন্ত্রণ জানায় হায়েনাদের। তারাও সেই নিমন্ত্রণে সাড়া দিতে কার্পণ্য করেনা ; নিজেদের গুহা থেকে প্রতিযোগিতা করে হু স্বরে জানান দেয় তাদের সম্মতির।

যদিও লেম্যান ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার নন, তবুও তিনি ক্যামেরাবন্দী করতে সক্ষম হয়েছেন হায়েনা আর আব্বাসের সখ্যতার কিছু বিরল দৃশ্যকে। এ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ” যখন আমি আব্বাসের সাথে থাকতাম, তখন আমি যা খুশি তাই করতে পারতাম। কিন্তু যখন আমার নিজস্বতার প্রশ্নটি আসে, তখন আমার বেশ অনেকটা সময় লেগেছিল হায়েনাদের বিশ্বাস অর্জন করতে। ” তিনি আরো বলেন, কোন এক রাতে একটি হায়েনা তাকে এবং আব্বাসকে তার ডেরায় নিয়ে যাচ্ছিল। পথে তিনি মৃত্যুভয়ে অস্থির হয়ে পড়লেও এক পর্যায়ে তিনি আবিষ্কার করলেন, কতটা অসাধারণ বোঝাপড়া রয়েছে আব্বাস আর হায়েনাদের মধ্যে। হায়েনারা আব্বাসকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়, অনুমতি দেয় যা ইচ্ছে তাই করার, এমনকী সেই গুহায় প্রবেশেরও, যেখানে ঘুমিয়ে ছিল নবজাতক হায়েনা শাবকেরা !

এই অভূতপূর্ব ঐতিহ্য প্রচলিত হয়ে এসেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ; যা এখন পরিণত হয়েছে অনেকটা প্রাকৃতিক নিয়মেই। এই ঐতিহ্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় , যেসব প্রাণীকে আমরা ভয় পেয়ে দূরে সরিয়ে রাখি, তারা আমাদের বন্ধু হতে পারে স্বচ্ছন্দেই। এজন্য আপন করে নিতে হবে তাদেরকে, উন্মেষ ঘটাতে হবে তাদের ভেতরকার মানবিকতার, ঠিক যেমনটা লেম্যান বলেন – ” কোন সন্দেহ নেই যে তারা বুনো আর কদাকার, কিন্তু তাদের ভেতরেও রয়েছে এক অপার্থিব সৌন্দর্য। অপেক্ষা কেবল সেই সৌন্দর্যকে প্রস্ফুটিত করার। ”

তথ্যসূত্রঃ ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক 
>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।