প্রচ্ছদ » সাইন্স ভিউ » বিজ্ঞান ফিচার » নক্ষত্রদের জন্মের ইতিহাস ( শেষ পর্ব )

নক্ষত্রদের জন্মের ইতিহাস ( শেষ পর্ব )

 আবদুল্লাহ আল মামুন | বাংলা ইনিশিয়েটর

নক্ষত্রের জন্মকে জানতে হলে আমরা প্রথমে সূর্যের জীবনের শুরুটা দেখে নিতে পারি। নক্ষত্ররা বিভিন্ন ভাবে জন্ম নেয়। আপাতত আমাদের অতিপরিচিত সূর্যের জন্ম-কথা শোনা যাক!

সূর্যকে যিনি ভাবতেন লোহিত উত্তপ্ত পাথর, তিনি অ্যানাক্সাগোরাস, খ্রিস্টপূর্ব ৫০০- খ্রিস্টপূর্ব -৪২৮ সালের বিজ্ঞানী। সূর্য একটা হাইড্রোজেন-হিলিয়াম গ্যাস এর বিশাল গোলক যার বাইরের পৃষ্ঠ হতে নির্গত হচ্ছে প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান আলো থেকে শুরু করে এক্সরে সহ নানা রকম তরঙ্গ! এ তরঙ্গগুলো সূর্যের বাইরের পৃষ্ঠ হতে বের হচ্ছে।

সূর্য নামের এই হাইড্রোজেন-হিলিয়াম গ্যাস এর বিশাল গোলকটাকে তার উচ্চ তাপমাত্রার কারনে উজ্জ্বল দেখায়। যেমন কোনো আলপিনকে বা লোহার তারকে তাপ দিতে থাকলে সেটা উজ্জল হয়ে ওঠে! আলপিন না হয় পুড়ে জ্বলে ওঠে, কিন্তু সূর্য?

আমরা সূর্যের যে আলোটা দেখি, সেটা সূর্যের বাইরের পৃষ্ঠের। পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৬০০০ ডিগ্রী পর্যন্ত হয়ে থাকে। কিন্তু সূর্যের ভেতরের অংশটুকু, যেখানে সূর্যালোক তৈরী হয় সেখানকার তাপমাত্রা ৪০ মিলিয়ন ডিগ্রী! প্রশ্ন জাগে, ভেতরের দিকে এত তাপমাত্রা কেন?!

নক্ষত্র ও গ্রহগুলি সৃষ্টি হয় ধূলিকণা, হাইড্রোজেন গ্যাস এবং প্লাজমা দ্বারা গঠিত এক ধরণের আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘ হতে। সৃষ্টির শুরুতে পরমাণু গুলি ( হাইড্রোজেন ) মহাকর্ষ বলের প্রভাবে পরস্পর কাছাকাছি আসা শুরু করে এবং জমাট বেঁধে আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘ বা নীহারিকা গঠন করে। মহাকর্ষ বলের কারনে তারা যত কাছাকাছি চলে আসে, মেঘের ভেতর পরমানু গুলোর সংঘর্ষ তত বৃদ্ধি পেতে থাকে। বাড়তে থাকে তাদের গতিশক্তি। গতিশক্তি আর সংঘর্ষের জন্য তাদের ভেতরে তাপমাত্রা ক্রমশ বেড়ে যেতে থাকে। এক দিকে মহাকর্ষ বলের জন্য মেঘ গুলো কেন্দ্র বরাবর সংকুচিত বা কাছাকাছি আসতে থাকে। ফলে কেন্দ্রের দিকে অংশ গুলোর ঘনত্ব তাপমাত্রা দুটোই মেঘের বাইরের দিকের তুলনায় বাড়তে থাকে।

তাপমাত্রা যখন ১০৭ K পৌছায়,শুরু হয় নিউক্লিয়াস ফিউশন। ফিউশন অর্থাৎ চারটা হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসের বিক্রিয়ায় একটি হিলিয়াম ও একটি গামা রশ্মি ফোটন হিসাবে নির্গত হতে থাকে। বিক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে প্রচুর শক্তি হারায়। কেন্দ্রের দিকে বিক্রিয়া শুরু হয়ে বহিঃপৃষ্ঠ অবধি তা বিস্তার লাভ করে। কেন্দ্রের দিকে তাই এত তাপমাত্রা!

এ প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। নক্ষত্র হতে বের হতে থাকে আলো। আর বিকিরণ চলাকালীন, বিকিরণ বাইরে বেরনোর সময় প্রচুর বহিঃচাপ সৃষ্টি হয়, বহিঃচাপ ও সংকোচন- বল সমান হওয়ায় সাম্যবস্থা আবির্ভাব হওয়ার কারনে মহাকর্ষ সংকোচন থেমে যায় এবং সাথে একটি নক্ষত্রের জন্ম হয়। নক্ষত্র একটি স্থায়িত্ব ও পূর্ণ অবস্থা পায়। সূর্য গত পাচঁ বিলিয়ন বছর ধরে এ অবস্থায় আছে । প্রতি সেকেন্ডে সে ৪×১০১৪ বা চারশ মিলিয়ন টন হাইড্রোজেনকে হিলিয়ামে পরিনত করে।

রাতের আকাশে আমরা যেসব তারা দেখি, দিনে সূর্যের প্রখর রোদ,  এরা সবই তাদের ভেতরের নিউক্লীয় ফিউশন এর ফল!
নক্ষত্রের জন্ম যেমন আছে মৃত্যুও তেমন আছে। মৃত্যুর কাহিনী অন্যদিন বলবো। তবে নক্ষত্রের বাবা-মা নিয়ে কথা বলতে গেলে মৃত্যুর কথা এসেই পরে।

আসলে নক্ষত্রের মৃত্যু এর ভরের উপর নির্ভর করে। এর ভর যদি সূর্যের তুলনায় অনেক বেশি হয় তবে তার মৃত্যু ঘটে, সংকুচিত হতে হতে বিস্ফোরণের মাধ্যমে।এ বিস্ফোরণকে সুপারনোভা বিস্ফোরণ বলে। বিস্ফোরণ এর আশেপাশে কোনো নীহারিকা বা মহাজাগতিক মেঘ থাকলে সুপারানোভাে বিষ্ফোরনের কারনে তারা সংকুচিত হতে শুরু করে। নিউক্লিয়াস ফিউশন শুরু হবার ফলে মেঘগুলোর মহাকর্ষবলজনিত সংকোচন বিলুপ্তি ঘটে। জন্ম হয় নতুন নক্ষত্রের!

এ অর্থে নক্ষত্রেরও বাবা-মা আছে। এক্ষেত্রে, শিশুর জন্মের পর মায়ের মৃত্যু হয় কিংবা মায়ের মৃত্যুর পরপর শিশুর জন্ম হয়।

চিত্র : ওরাইয়ন নীহারিকা

সূর্যের মত নক্ষত্ররা ওরাইয়ন নীহারিকার মত বিশাল মেঘের ভেতর সৃষ্টি হয়। প্রতিটা নীহারিকাতে হাজারো শিশু নক্ষত্র ক্ষীণ আলো ছড়াতে থাকে । দূর থেকে দেখলে অন্ধকারাবৃত নীহারিকা, কিন্তু ভেতরেই নবজাতক নক্ষত্ররা উজ্জলতা বাড়িয়ে নিচ্ছে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে, নক্ষত্র গুলোর মাঝে দূরত্ব বাড়তে থাকে। তারা নীহারিকা হতে চলে যায় বহুদূরে। আমাদের গ্যালাক্সীতে হয়তো প্রায় ডজন খানেক নক্ষত্র থাকতে পারে যারা ৫ বিলিয়ন বছর আগে থেকে সূর্যের ভাই-বোন। কিন্তু আমরা তাদের চিনিনা। তারা হয়ত মিল্কিওয়ের বিপরীত পার্শ্বে অবস্থিত।

নক্ষত্ররাও মানুষের মত, প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে পরিবার হতে সরে গিয়ে আপন পথে চলে। এ নক্ষত্রের সাথে আমাদের এত মিল। বাবার মার সাথে মিল আছে সন্তানের। তাহলে, নক্ষত্র আমাদের কে?!

চোখ রাখুন পরবর্তী সিরিজ “নক্ষত্র এবং আমরা“তে।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।