প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » আমার কথা » বাংলা কি আসলেই ক্ষ্যাত?

বাংলা কি আসলেই ক্ষ্যাত?

প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০১৭৯:১১:৪১ অপরাহ্ন

[pfai pfaic=”fa fa-pencil ” pfaicolr=”” ] সৃজা জামান | বাংলা ইনিশিয়েটর

‘দোস্ত,জানিস কালকে একটা বাংলা সিনেমা দেখলাম,সুন্দর আছে’।
‘ছি! দোস্ত তুই বাংলা সিনেমা দেখস?ইয়াক! তুই তো দেখি ক্ষ্যাত!’

উপরের কথাগুলো আমাদের পরিচিত। বিশেষ করে এই প্রজন্মের কাছে। হয়তোবা কখনো কথাগুলো আমাদেরকেই বলা হয়।

আমরা বাঙালি। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। বাংলাদেশ আমাদের দেশ।কিন্তু আজকাল আমাদের মধ্যে এই পরিচয়গুলো নিয়ে কেন যেন লজ্জাবোধ হয়। কোথাও কেউ বাংলা গান গাইলে যেন আমাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়।

আজকালকার পিতা-মাতারা তাদের সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে ভর্তি করান। বাচ্চাকে অ, আ, ক, খ প্রথমে শেখান না, শেখান A, B, C, D। কারো সাথে দেখা হলে বলেন, “জানেন আমার বাচ্চা না A to Z, 1 to 10 বলতে পারে”।

কারো চুল পড়ে যাবার সমস্যা বা ত্বকের সমস্যা হলে আমরা বলি অমুক বিদেশি ব্র্যান্ডের শ্যাম্পু, ক্রিম ব্যবহার করবেন। দেশি জিনিস ভুলেও ব্যবহার করবেন না, আপনার চুল, ত্বক একদম নষ্ট করে ফেলবে। ছোটখাট রোগ হলেও যাই বিদেশে। দেশি চিকিৎসক আবার কী করতে কী করে ফেলে!

নতুন ফোন কিনতে হবে? বিদেশী ব্র্যান্ড হতে হবে অবশ্যই। দেশি ওয়ালটন-টোয়ালটন কে কিনে আবার! একটা মান-সম্মান আছে না?  সবাই কি বলবে? আবার নষ্ট হওয়ার ভয়ও আছে। দেশি বলে কথা!  এদেশে কোনো ভালো জিনিস তৈরি হতে পারে?

আচ্ছা, আপনার বাসার কথা বাদই দিন, কয়জনের বাসায় আপনি দেখেছেন যে বাথরুমে কেয়া অথবা তিব্বত সাবান? কয়জনকে দেখেছেন দেশি চকলেট বিদেশি কাউকে উপহার দিতে?

ছুটি পেলেই অনেকে ঘুরতে যান। যেনতেন জায়গায় নয়, যেতে হবে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য। রাঙামাটি, জাফলং, সুন্দরবন নিশ্চয়ই নয়। বিয়েতে গান বাজাতে হবে। নাচের জন্যও গান ঠিক করতে হবে। কী গান? বাংলা গান? মোটেও না; হিন্দি ছাড়া চলবেই না।

দোস্ত, এবার জন্মদিনে কিন্তু আমেরিকান বার্গারেই ট্রিট হবে!

আচ্ছা, এরকম তো হওয়ার কথা ছিল না। কথা ছিল আমরা যতো ইচ্ছা ততো জোরে চিল্লিয়ে গাইবো বাংলা গান। যখন ইচ্ছা তখন যাব সুন্দরবন, রাঙামাটি। জোছনা রাতে সবাই মিলে খাব মায়ের হাতের পিঠা, নারিকেলের চিড়া। গাইবো রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি। দেশের জিনিস কিনব আর বলব – বাংলার জিনিস বুঝলি, বাংলার! জন্মদিনে বন্ধুর আম্মার হাতের বিশেষ পিঠা। নাহলে কিন্তু জীবন বৃথা! গায়ে হলুদে গাইবো ‘হলুদ বাটো, মেন্দি বাটো।’

শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলার জন্যই এই বাঙালি বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়েছিলো রাজপথে। শুধুমাত্র শত্রুবিহীন মাটির জন্য প্রাণ দিয়েছিল দামাল ছেলেরা।

কিন্তু হায়! আজ বাংলার নতুন প্রজন্ম নিজেকে বাঙালি পরিচয়ে পরিচিত করতে দ্বিধাবোধ করে। ওসব নাকি ক্ষ্যাত! নিজেকে তারা পশ্চিমা সংস্কৃতিতে গড়ে তোলে।  আচ্ছা, বাঙালি পোশাকে অভ্যস্ত কয়জন পশ্চিমা? বাংলা গানই বা শোনে কয়জন? এসব শুনলে অনেকেই ভাববেন, কি সব পাগলামি কথাবার্তা! আচ্ছা, যদি এটা পাগলামি হয় তবে আমাদের কাজগুলোও কি পাগলামি নয়? ভেবে দেখবেন।

যদি আসলেই মর্যাদাবান হতে চান, হতে চান সম্মানী ; তবে নিজের দেশের কথা ভাবুন। নিজের দেশের গান গান, পোশাক পরুন, খাবার খান। বাংলার অনেক অপূর্ব সুন্দর স্থান আছে যা আপনি দেখেন নি। সেখানে যান। তাই বলে যে ইংরেজি জানবেন না, তা নয়।তবে সবার আগে নিজের দেশ। যখন আপনি পশ্চিমা পোশাক পরে পশ্চিমা দেশের রাস্তায় হাঁটেন তখন সে দেশের জন্য সেটা স্বাভাবিক। ভেবে দেখবেন এতে কিন্তু আপনার মান ক্ষুণ্ণ হচ্ছে না। অথচ বাংলাদেশে বাঙালী সাজে থাকতে আপনি লজ্জা পান। নতুন প্রজন্মের অংশ হয়ে আমি লজ্জিত।

অন্যকে সম্মান করবেন, শ্রদ্ধা করবেন, তবে নিজের পরিচয়টা ভুলবেন না। বাংলাদেশ বহু রক্তের দামে কেনা। অনেক মা-বোনের সম্ভ্রমে কেনা। তাকে ভুলবেন না। নয়তোবা আবার আসবে সেই কালো দিন, যেদিন আপনাকে আমাকে বাঁচাতে আর কেউই থাকবে না।

শেষে এইটুকুই বলব, গৌরিপ্রসন্ন মজুমদারের কথায়,এই বাংলায়, “অন্ধকারে,পুব আকাশে/উঠবে আবার দিনমণি।”

বাংলাকে ভালোবাসুন। নিজের দেশকে ভালোবাসা কি কখনো ক্ষ্যাত, আনস্মার্ট হতে পারে? যে দেশের জল – বাতাস আপনি গ্রহণ করে বেঁচে আছেন, তাকে ভালোবাসাই আনস্মার্ট! মনে রাখবেন, যে ক্ষ্যাত শব্দটা আপনি দুই মিনিট পর পর বলছেন, তাও কিন্তু বাংলা!

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ইনিশিয়েটর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ইনিশিয়েটর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।