প্রচ্ছদ » আন্তর্জাতিক » উৎসর্গী জীবন মাদার তেরেসার !

উৎসর্গী জীবন মাদার তেরেসার !

প্রকাশ : ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭১০:৪৫:৪৮ পূর্বাহ্ন

[pfai pfaic=”fa fa-pencil ” pfaicolr=”” ] সুরাইয়া আক্তার জীম | বাংলা ইনিশিয়েটর

কলকাতার একটি রাস্তার পাশ দিয়ে কুজো হয়ে হাটছিলেন এক বৃদ্ধা নারী। পথের ধারে থাকা মানুষদের ছুয়ে যাচ্ছেন সেই বৃদ্ধা। আর তাঁর হাতের স্পর্শে মানুষগুলোর মুখে ছড়িয়ে দিচ্ছিল অনাবিল আনন্দ, খুশি। এমনিভাবে যে তাঁর সারাজীবন বিলীন করেছেন মানুষের সেবায় তিনি আর কেউ নন, সেইন্ট বা সন্ন্যাসী মাদার তেরেসা।তিনি দরিদ্র, অসুস্থ ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর পাশে দাড়িয়েছেন অপার আনন্দ নিয়ে। শুধুমাত্র মানুষের এক চিলতে হাসির জন্য তিনি তার পুরো জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। আর আজ সেই মহাত্মা মাদার তেরেসার ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী।

সেইন্ট মাদার তেরেসা ১৯১০ সালের ২৬আগস্ট আলবেনীয় বংশোদ্ভূত বাবা নিকোলো ও মা দ্রানা বয়াজুর গর্ভে জন্ম নেয়। সর্ব কনিষ্ঠ সন্তান থাকা অবস্থায় ১৯১৯ সালে মাত্র আট বছর বয়সে তিনি বাবা হারান। এরপর থেকেই মূলত রোমান ক্যাথলিক আদর্শে লালিত-পালিত হতে থাকেন তিনি। মাত্র ১২ বছর বয়সেই তিনি ধর্মীয় জীবন যাপনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। ১৮ বছর বয়সে তিনি গৃহত্যাগ করেন এবং একজন মিশনারি হিসেবে যোগ দেন ‘সিস্টার্স অফ লোরেটো’ সংস্থায়। এরপর নিজের মায়ের সাথে আর কোনোদিন দেখা হয়নি তেরেসার।

জীবনের শুরুর দিকে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার প্রতি মনোনিবেশ করেন তিনি। কারণ এই ভাষাই ছিল ভারতে সিস্টার্স অফ লোরেটোর শিক্ষার মাধ্যম। ১৯২৯ সালে ভারতে এসে দার্জিলিঙে নবদীক্ষিত হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৩১ সালের ২৪ মে তিনি সন্ন্যাসিনী হিসেবে প্রথম শপথ গ্রহণ করেন। এই সময় তিনি মিশনারিদের পৃষ্ঠপোষক সন্ত Thérèse de Lisieux –এর নামানুসারে টেরিজা নাম গ্রহণ করেন।

১৯৩৭ সালের ১৪ মে পূর্ব কলকাতায় একটি লোরেটো কনভেন্ট স্কুলে পড়ানোর সময় তিনি চূড়ান্ত শপথ গ্রহণ করেন। কোলকাতার দারিদ্রতা ছাড়াও পঞ্চাশের মন্বন্তর এবং ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা তার মনে গভীর সারা ফেলে।

১৯৪৬ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর ধর্মীয় নির্জনবাসের জন্য দার্জিলিং যাওয়ার সময় তার মধ্যে এক গভীর উপলব্ধি আসে, যা তিনি “the call within the call” হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। তিনি আরও বলেছিলেন, “কনভেন্ট ত্যাগ করে দরিদ্রদের মাঝে বাস করা এবং তাদের সহায়তা করা আমার জন্য আবশ্যক ছিল। এটা ছিল এক সরাসরি আদেশ। এই আদেশ পালনে ব্যর্থ হওয়ার অর্থ ছিল বিশ্বাস ভেঙে ফেলা।”

১৯৪৮ সালে দরিদ্রের মাঝে মিশনারি কাজ শুরু করেন। প্রথাগত লোরেটো অভ্যাস ত্যাগ করেন। পোশাক হিসেবে পরিধান করেন নীল পারের একটি সাধারণ সাদা সুতির বস্ত্র। তখন থেকেই তেরেসা ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করে বস্তি এলাকায় কাজ শুরু করেন। ১৯৫০ সালের ৭ই অক্টোবর তেরেসা “ডায়োসিসান কনগ্রেগেশন” (বিশপের এলাকার মত সমাবেশ) করার জন্য ভ্যাটিকানের অনুমতি লাভ করেন। এ সমাবেশই পরবর্তীতে মিশনারিস অফ চ্যারিটি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

১৯৫২ সালে মাদার তেরেসা কলকাতা নগর কর্তৃপক্ষের দেয়া জমিতে মুমূর্ষুদের জন্য প্রথম আশ্রয় ও সেবা কেন্দ্র গড়ে তোলেন।যার নাম পরবর্তীতে নির্মল হৃদয় রাখা হয় । ১৯৬০-এর দশকের মধ্যে ভারতের সর্বত্র আশ্রয় কেন্দ্র, চিকিত্সা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয় ।

ভারতের পর মিশনারিস অফ চ্যারিটির কাজ দ্রুত ছড়িয়ে পরে বিশ্বব্যাপী । ১৯৯৬ সালে পৃথিবীর ১০০ টিরও বেশি দেশে মোট ৫১৭টি মিশন পরিচালনা করছিলেন। মাত্র ১২ জন সদস্য নিয়ে যে চ্যারিটির যাত্রা শুরু হয়েছিল সময়ের ব্যবধানে তা কয়েক হাজারে পৌঁছোয়। তারা সবাই বিভিন্ন দেশের প্রায় ৪৫০টি কেন্দ্রে মানবসেবার কাজ করে যাচ্ছিল। গরিবদের নিয়ে কাজ করতো এই চ্যারিটি যা এখনও করে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চ্যারিটির প্রথম শাখা প্রতিষ্ঠিত হয় । ১৯৮৪ সালের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রে চ্যারিটির প্রায় ১৯টি শাখা সক্রিয়ভাবে কাজ করা শুরু করে।

তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার , ১৯৮০ সালে ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্ন লাভ করেন এবং SAINTHOOD ২০১৬ পুরস্কার লাভ করেন।

এ মহান মানব ১৯৯৭ সালের আজকের দিনেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চির নিদ্রায় শায়িত হন। মাদার টেরিজার মৃত্যুর সময় বিশ্বের ১২৩টি রাষ্ট্রে এইচআইভি/এইডস, কুষ্ঠ ও যক্ষার চিকিৎসাকেন্দ্র, ভোজনশালা, শিশু ও পরিবার পরামর্শ কেন্দ্র, অনাথ আশ্রম ও বিদ্যালয়সহ মিশনারিজ অফ চ্যারিটির ৬১০টি কেন্দ্র বিদ্যমান ছিল। তার স্মরনে এই দিনটিতে আন্তর্জাতিক দাতব্য দিবস হিসাবে পালন করা হয়।

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।