প্রচ্ছদ » আন্তর্জাতিক » ব্লু হোয়েল এবং অঘোষিত একটি গণহত্যা

ব্লু হোয়েল এবং অঘোষিত একটি গণহত্যা

 নওরীন মুনতাহান ছোঁয়া

সাইবার জগতের ফাঁদে পা দিয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করেছে এমন মানুষের সংখ্যা হিসাব করলে বেশ বড়সড় একটা সংখ্যার মান আসবে।কিন্তু সাইবার জগতের এসব ফাঁদ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বা নির্ধারিত জনগোষ্ঠী কে উদ্দেশ্য করে তৈরি করা হয়।কিন্তু যদি এমন হয়-সাইবার জগতে এমন একটা পরিবেশ তৈরিই করে রাখা হয়েছে যাতে মানুষ দলে দলে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হবে, তবে কি সেটা বিশ্বাসযোগ্য হবে?বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে জায়গা দখল করে নিয়েছে একটি গেম।ভয়,শঙ্কা,অবিশ্বাস,বিস্ময় আর তীব্র কৌতূহল মিশ্রিত একটা নাম-ব্লু হোয়েল। হ্যাঁ,একটি গেম,একটি নাম আর এতগুলো অকাল মৃত্যু। ব্লু হোয়েল গেম শুনলে আমজনতা ধরেই নিবে বাচ্চাদের খেলার জন্য কোনো গেম।
তবে এই খেলা যে কিশোর কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যা স্পৃহাকে জাগিয়ে তুলে এতোগুলো প্রাণ কেড়ে নিবে, এটা কার ধারণা ছিল?চলুন একটু ঘেঁটে দেখা যাক কী এই ব্লু হোয়েল গেম। ব্লু হোয়েল গেম বা ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জ একটি অনলাইন গেম যা কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে হতাস্মিবোধ কে জাগিয়ে তুলে। তাদেরকে প্ররোচনার মাধ্যমে মানসিক চাপ প্রয়োগ করে এটাই বুঝাতে চায় যে-পৃথিবীতে বেঁচে থেকে কিছুই হবে না,তাই আত্মহত্যা করে নিজেকে পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা থেকে মুক্ত করাই শ্রেয়।
গেমটির নির্মাতা একজন ২১ বছর বয়সী রাশিয়ান তরুণ,নাম ফিলিপ বুদেকীন। ২০১৩ সালে সে এই গেমটি তৈরি শুরু করে এবং VK নামক একটি যোগাযোগ মাধ্যম থেকে প্রথমবারের মতো কিশোরকিশোরী দের আকৃষ্ট করতে শুরু করে বিভিন্ন ভীতিকর ছবি বা ভিডিও দেখিয়ে। গেমটি নিয়ন্ত্রণ করে একজন অ্যাডমিন যাকে কিউরেটর বলা হয়। তথ্যসূত্রে জানা গিয়েছে যে অনলাইনে F57 নামে বিভিন্ন গ্রুপে দুঃখমূলক বিভিন্ন পোস্ট করা হয়।সেখানে ফেইক আইডি থেকে “I want to play blue whale game” এ ধরণের কমেন্ট করা হয়। আগে থেকেই হতাশাগ্রস্ত কিশোররা কৌতূহলবশত এই গেমের সাথে জড়িয়ে পরে।
প্রাথমিকভাবে কিউরেটর কথাচ্ছলে সেইসকল কিশোর কিশোরীর থেকে বিভিন্ন তথ্য আদায় করে নেয়।তখন কিউরেটর বিভিন্নভাবে তাদেরকে এটাই বুঝায় যে-পৃথিবীতে বেঁচে থেকে কোনো লাভ নেই। এরপর আসে মূল অংশ। এখানে কিউরেটর খেলোয়াড়কে ৫০ টি টাস্ক দেন যা পালন করা বাধ্যতামূলক। এসব টাস্ক খেলোয়াড় সম্পূর্ণ ভাবে পালন করেছে এটার প্রমাণ হিসেবে খেলোয়াড়কে ছবি তুলে বা ভিডিও কলের মাধ্যমে কিউরেটরের সাথে যোগাযোগ রাখতে হয়।টাস্ক গুলো প্রথম দিকে তুলনামূলক সহজ হলেও ধীরে ধীরে তা ভয়ংকর হতে থাকে। প্রথম দিকে টাস্কগুলার মধ্যে হরর মিউজিক শোনা ,৪.২০ এ উঠে হরর মুভি দেখা,ছাদের রেলিঙের উপর দাঁড়িয়ে কিউরেটরের সাথে ভিডিও কলে কথা বলা, গভীর রাতে রেললাইন ধরে একা একা হাঁটা অন্যতম। ধীরে ধীরে টাস্ক গুলো ক্রমশ কঠিন হতে থাকে, যেমন- নিজের হাতে ব্লেড দিয়ে তিমির ছবি আঁকা বা F57 লেখা, শরীরের বিভিন্ন অংশে সুঁই দিয়ে নকশা করা, ক্ষতবিক্ষত করা ইত্যাদি। আর সর্বশেষ টাস্ক টি হলো-আত্মহত্যা করা। এই পর্যন্ত শতাধিক আত্মহত্যা ঘটানোর গ্লানি রয়েছে গেমটার উপর।

প্রশ্ন উঠতে পারে যে,গেমে বললেই আমি আত্মহত্যা কেন করব। গেমটা অল্টারনেট রিয়েলিটির উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে খেলোয়াড় যা করছে সব বাস্তব জগতে কিন্তু সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে ভার্চুয়াল জগত। এই দুই জগতের মিলিত স্থান ই হলো -ব্লু হোয়েল।
কেউ যদি এসব টাস্ক পূরণে অস্বীকৃতি জানায় তবে কিউরেটর তাকে এক ধরণের মানসিক চাপে ফেলে এসব কাজ করতে বাধ্য করবে। তাকে হুমকি প্রদর্শন করবে, পরিবারের সদস্যদের মেরে ফেলার ভয় দেখাবে-তাই বাধ্য হয়ে খেলোয়াড় বা গেমার এসব টাস্ক পূরণে রাজি হবে। ব্লু হোয়েলের মূল হাতিয়ার হচ্ছে-মানুষের মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণ করা যার ফলে মানুষের বিবেকবোধ একেবারে শূন্য কোঠায় নেমে আসতে বাধ্য।

কথা হচ্ছে, এই খেলাটা কেন এখনো বন্ধ করা হচ্ছে না। কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিয়েছে ঠিকই, সমস্ত লিংক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এখনো কিছু মাস্টারমাইন্ডেড মানুষ অন্যান্য নামে এই গেমটিকে জীবিত রেখেছে। যেখানে মানুষ ই মানুষের শত্রু, সেখানে সাধারণের অসাধারণত্ব দেখানোর জায়গা খুব ই সীমিত।

চলুন আরেকবার একটু অতীতে যাই।ফিলিপ বুদেকীন,মাত্র ২১ বছরের রাশিয়ান এই তরুণ এখন সারাবিশ্বের একটি ভীতির নাম।২০১৩ সালে সে এই প্রাণঘাতী খেলা শুরু করলেও তা সবার দৃষ্টিগোচর হয় ২০১৬ সালে, একজন রাশিয়ান সাংবাদিকের মাধ্যমে।সে তার রিপোর্টে কমপক্ষে ১৬ জন তরুণীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর কথা উল্লেখ করেন। কেন এই কিশোর-তরুণরা ঝাঁকে ঝাঁকে মৃত্যুবরণ করছে? রাশিয়া এমন একটি দেশ, যেখানে ২৪ ঘণ্টাই সবাই নিজেকে কাজের মধ্যে ব্যস্ত রাখতে চায়, সেখানে অবসর বলতে বিস্তৃতভাবে কোনো শব্দের প্রয়োগ হয় নাকি সন্দেহ আছে। আত্মহত্যা করা সংখ্যার মধ্যে অধিকাংশ ই ছিল মেয়ে। এরা সবাই ১২-১৭ বছর বয়সী।কেন তারা এই ভাবে নিজেদের শেষ করে দিল?

নিহত সবাই প্রায় বিষণ্ণতায় ভুগতো।তারা সবাই নিজেদেরকে ভার্চুয়াল জীবনে এমনভাবে আটকে ফেলেছে যেখান থেকে বের হওয়া সহজ নয়। তারা চাইতো বাবা-মায়ের ভালোবাসা আর যত্ন। কিন্তু এতো বিশাল দেশে অন্যকে সময় দেওয়ার অবসর মানুষের নেই। দীর্ঘকাল এরকম একাকিত্বের জন্য একসময় এই কিশোর কিশোরীরা নিজেদের চারপাশে একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে ফেলে, একটা আলাদা অদৃশ্য জগত।নিজেদেরকে নিয়েই, নিজেদেরকে প্রাধান্য দিয়েই তৈরি হয় তাদের কল্পিত দুনিয়া। সাইকোলজিক্যালি এটাকে Narcissistic Personality Disorder বা স্বনির্ভরতা সমস্যা বলা হয়। ঠিক এই সুযোগ টাই কাজে লাগায় ফিলিপ।বিষণ্ণতায় ভোগা এই তরুণীদের নিজের প্রতি আকৃষ্ট করে সে। তার ফাঁদে পা দিয়ে তরুণীরা ভুলে যায় নিজেদের অতীত।তারা মৃত্যুকেও পরোয়া করে না।প্রমাণ মিলেছে,ফিলিপের জন্য আত্মহত্যার সময় এক কিশোরী লেখে গিয়েছে “happy to die”

কে এই ফিলিপ বুদেকীন?ফিলিপ বুদেকীন সাইকোলজির একজন শিক্ষার্থী ছিল যাকে ২০১৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেয়া হয়।এরপরেই সে শুরু করে প্রাণঘাতী এই খেলা তৈরির কাজ। সে মোটেও এটার জন্য অনুতপ্ত নয় বরং সে তার এই হত্যালীলাকে “society cleaning” বলে। তার ভাষ্যমতে আত্মহত্যাকারীদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।

এই পর্যন্ত মনে মনে ফিলিপকে অনেক গালমন্দ করেছেন সবাই। চলুন একটু ভিন্নভাবে ভেবে দেখা যাক। ফিলিপ বুদেকীন নিঃসন্দেহে একজন অসাধারণ মেধার অধিকারী। কিন্তু জীবনের বিভিন্ন প্রতিঘাতে সে জীবনকে সবসময় নেতিবাচক ভঙ্গিতেই দেখে এসেছে। কল্পনা করুন একবার,আপনি অসামান্য মেধার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও যদি আপনাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়, তবে আপনার কেমন লাগবে? আপনি অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয় কে বাহবা দিবেন না। হ্যাঁ,এটা স্বীকার করতেই হবে-ফিলিপের কাজটি ক্ষমার অযোগ্য কিন্তু সে কেন এটা করলো এটা কয়জন ভেবে দেখেছেন? আর এতোগুলো কিশোর-কিশোরীর অকালে মৃত্যু প্রবণতা কিন্তু তাদের অভিভাবকের অবহেলার জন্য ই সম্ভব হয়েছে।

পৃথিবীতে শেখার কোনো শেষ নেই। এই ঘটনাটা কি আমাদের বিবেকে একবার ও নাড়া দিবে না? কেউ ই নিজে থেকে খারাপ হয় না, তার চারপাশ,পরিবেশ তাকে বাধ্য করে খারাপ হতে। আপনার আমার একটু অবহেলাই পারে আরেকজনের জীবনকে ধ্বংস করে। বিশদভাবে বলতে গেলে-অবহেলাই সকল সমস্যার মূল। কবি তাই বলেছেন, “বড়ই কঠিন জীবন দেওয়া যে জীবন নেওয়ার চেয়ে”
আপনি অবহেলা করতেই পারেন, কিন্তু সেই অবহেলা যেন কখনো কারোর বিপথে যাওয়ার কারণ না হয়।

>
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।