প্রচ্ছদ » কিশোর তারকা » প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে সোহেল

প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে সোহেল

প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০১৭৯:০৩:০০ অপরাহ্ন

[pfai pfaic=”fa fa-pencil ” pfaicolr=”” ]  খাতুনে জান্নাত | বাংলা ইনিশিয়েটর
গতবছর বাবার ওপর খুব রাগ হয়েছিলো। রাগের কারণ খুবই গুরুতর। আমাকে ফেলে সে একা একা বান্দরবন ঘুরতে চলে গিয়েছিলো! কী খারাপ! রেগে গিয়ে যখন ঠিক করলাম আর কখনো বাবার সাথে কথা বলব না, তখন বাবা বান্দরবন থেকে ফিরে এলো অনেক উপহার সঙ্গে নিয়ে। অগত্যা কথা বলতেই হলো! ইয়ে…নিজের ক্ষতি করে আর কী লাভ! বাবার মুখে শুনেছিলাম বান্দরবনের গল্প। দেখেছিলাম কয়েক’শ ছবি। জীবন যেন একটা খেলা খেলে সেখানকার মানুষের সঙ্গে। খাবারের অভাব, পরিষ্কার পানীয়ের অভাব, বেঁচে থাকতে প্রয়োজনীয় রসদের অভাব – সবকিছুকে ছাপিয়েও সেখানকার মানুষ বেঁচে আছে। যেখানে বেঁচে থাকতেই এতো লড়াই, সেখানকার মানুষের জন্য শিল্প-সাহিত্যের কথা চিন্তা করতে যাওয়া নিতান্তই হাস্যকর!

ছবি এঁকে আনন্দ পায় সোহেল ঘোষ।

তারপরও সেখানকার কিছু মানুষ স্বপ্ন দেখে। শুধু বেঁচে থাকার স্বপ্ন না, কী নিয়ে বেঁচে থাকবে সেই স্বপ্ন, যা করতে চায় তা করে দেখানোর স্বপ্ন। সেই তালিকায় আছে লামা মাতামুহুরী ডিগ্রী কলেজের উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সোহেল ঘোষ। ঢাকা থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে বান্দরবনের লামায় যেখানে জীবন চালানোই দুরূহ, সেখানে ছবি আঁকাকে জীবনের সঙ্গী করে নিয়েছে সে। চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার সময় বাবা একবার একটা গ্রামের দৃশ্য এঁকেছিলেন, তা দেখেই সোহেলের ছোট্ট মনটাতে অংকনের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। ধীরে ধীরে সেই আগ্রহ একসময় নেশায় পরিণত হয়, হয়ে ওঠে স্বপ্ন। বাবাই তাই সোহেলের জীবনের আদর্শ।

হয়তোবা জীবন এতটা কষ্টের হয়ে উঠতো না যদি না ছোটবেলায় সোহেলের বাবার দোকান পুড়ে যেত। ওই দোকানই ছিল তাদের পরিবারের রোজগারের একমাত্র চাবিকাঠি। তাই দোকান পুড়ে যাওয়াতে যেন অথৈ সাগরে পড়ে যায় তাদের পরিবার। সেসময় আবার নতুন করে সব শুরু করার পর সোহেল এবং তার বড় ভাইকেও দোকানের কাজে সাহায্য করতে হয় বাবার সাথে। তবে সোহেল যাই করুক না কেন, আঁকাআঁকিই ছিল সবসময় তার সর্বক্ষণের সঙ্গী। দোকানের কাজের মধ্যেও সে ছবি আঁকতো। এমনকি স্কুলের বই-খাতাতেও সে ছবি এঁকে ফেলতো। শিক্ষকদের কাছে এ কারণে সে কম বকা খায় নি। এমনকি সহ্য করেছে প্রহারও!

সোহেল ঘোষ এর আঁকা চিত্রকর্ম ” মায়ার আদলে হাসি”

সপ্তম শ্রেণীতে থাকাকালে ২৬ মার্চ উপলক্ষ্যে সোহেলদের স্কুলে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা হয়। এক বন্ধুর কাছে সেই খবর পেয়ে সে সেখানে অংশগ্রহণের জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। কিন্তু বাবাকে বলতে ভয় পায়। তাই দাদা রুবেল ঘোষের কাছ থেকে ১০ টাকা নিয়ে পেন্সিল-রাবার কিনে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। সেই প্রতিযোগিতায় প্রথম হয় সে। পুরস্কার নেবার সময় বিস্ময়ে সবাই তার দিকে তাকিয়ে থাকে। অবাক হয়ে দেখে দোকানে কাজ করার ধূলো-ময়লা মাখা পোশাক পরা এক ছেলে মঞ্চ থেকে প্রথম পুরস্কার নিচ্ছে। নিজের চোখে দেখেও যেন ব্যাপারটা বিশ্বাস হতে চায় না!

সোহেল সেদিন বাবাকে প্রণাম করে পুরস্কারটা বাবার হাতে দিয়ে বলেছিলো সে প্রথম হয়েছে। বাবা রেগে গিয়ে পুরস্কারটা ছুঁড়ে ফেলে বলেছিলেন, “এসব দিয়ে ভাত জোটে না!” তবুও বাবার ওপর সোহেলের একটুও রাগ হয় নি। কারণ সে জানে, বাবা মুখে যাই বলুক, তার আঁকা নিয়ে বাবার মনে আশা আছে।

এক বছর হলো সোহেলের বাবা এই পৃথিবীতে নেই। এতে বড্ড ভেঙ্গে পড়েছিল সে। আঁকাআঁকি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলো। তখন তার দাদা তাকে বলেছিলো, “যদি কখনো পথেও নামা লাগে, তবু আঁকাআঁকি ছাড়বি না!” দাদার অনুপ্রেরণাতেই এখনো এত প্রতিকূলতার মধ্যেও সোহেল আঁকাআঁকি করে যাচ্ছে। তার ভাষ্যমতে, “আমাকে নিয়ে দাদার অনেক স্বপ্ন।”

বাংলা ইনিশিয়েটর এর সম্পাদক সবুজ শাহরিয়ার খান এবং NTAPF 2017 এর অন্যান্য আয়োজকদের সাথে বিজয়ী সোহেল ঘোষ। ছবিঃ মিনহাজ

গত ৪,৫,৬ তারিখ শিশু-কিশোর সাংবাদিকতা ও লিডারশীপ প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলা ইনিশিয়েটর’-এর উদ্যোগে আয়োজিত হয়ে গেল ‘NTAPF- National Teen Art and Photography Festival 2017’। এই প্রতিযোগিতায় সারা দেশ থেকে প্রায় কয়েক হাজার আর্ট এবং ছবি জমা পড়ে। এর মধ্য থেকে প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচিত হয় ১২৩ টি ছবি এবং ৩০ টি চিত্রকর্ম। সারাদেশ থেকে নির্বাচিত ৩০ টি চিত্রকর্মের মধ্যে ছিল সোহেল ঘোষের দুইটি ছবি এবং এর মধ্যে “মাতৃকোল” ছবিটি কলেজ বিভাগে প্রথম পুরস্কার পায়!

সোহেল ঘোষ এর আঁকা চিত্রকর্ম ” মাতৃকোল”

সোহেল যখন প্রথম ফেসবুকে ইভেন্টটি দেখে তখনই তা তার দাদাকে জানায়। তার দাদা সাথেসাথেই তাকে কাজ শুরু করে দিতে বলে। ইমন নামে এক আলোকচিত্রীর ক্যামেরায় থাকা লামার এক মা ও শিশুর ছবি সে প্রায় আঠারো দিন ধরে আঁকে। তারপর সেই ছবি জমা দেয় প্রতিযোগিতায়। প্রদর্শনীর জন্য তার ছবি নির্বাচিত হওয়ার পর সে আর তার দাদা ঠিক করে ঢাকায় আসবে। কিন্তু এক মাস পরেই তার বাবার মৃত্যুবার্ষিকী, তাই এখন প্রচুর খরচ। ঢাকায় আসতে হলে তার দাদার ওপর খুব চাপ পড়ে যায়। সেটা বুঝতে পেরেই সে তার তার অ্যান্ড্রয়েড ফোনটা বিক্রি করে দেয়! সোহেল বলে, “মোবাইলটা বিক্রি করে ঢাকায় এসেছি। এতে দাদার ওপর চাপ কিছুটা কমেছে। তাছাড়া কিছু টাকাও জমিয়ে ফেলেছিলাম ঢাকায় আসার আগে”।

সোহেলের এত কষ্ট করে ঢাকার আসা একেবারে ব্যর্থ হয় নি। সারাদেশের সকল প্রতিযোগীর মধ্যে কলেজ বিভাগে সে প্রথম হয়। পুরস্কার পাওয়ার পর সোহেল এবং একটু দূরে দাঁড়িয়ে তার দাদা যে তৃপ্তির হাসি হাসছিলেন, তা দেখেই যেন শতজন্ম কোনো কিছুর পরোয়া না করে বেঁচে থাকা যায়!

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।