প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » সম্পাদকীয় » এই প্রজন্মের মূল স্বার্থকতা কোথায়?

এই প্রজন্মের মূল স্বার্থকতা কোথায়?

প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০১৭৭:২৭:৫৭ অপরাহ্ন

খাতুনে জান্নাত 
শিক্ষানবিস সহ-সম্পাদক | বাংলা ইনিশিয়েটর

একবিংশ শতাব্দী, আধুনিক সভ্য সমাজ এবং আমাদের প্রজন্ম – বুঝতে পারছি না কোনটা কোনদিকে যাচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীটা অনেক বেশি আধুনিক হওয়ার কথা ছিল। এই আধুনিক মানে কিন্তু ‘ইয়ো ডুড’ না, এই আধুনিকতা হলো আক্ষরিক অর্থেই আধুনিকতা। কিন্তু তা না হয়ে আমাদের প্রজন্ম স্বাধীনতাটার সুযোগটাকে অন্যভাবে নিয়ে আধুনিকতার সংজ্ঞাটাকে বদলে দিয়ে সেটাকে ভিন্নভাবে প্রয়োগ করছে। কী বলব এই প্রজন্মকে? নষ্ট প্রজন্ম?

রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। প্রচন্ড ভিড় থাকায় ভালোমতো তাল রেখে হাঁটতে পারছি না। তাই সামনে দিয়ে যাওয়া মেয়েটার জুতার ওপর আমার পা লেগে যায়, জুতাটা খুলে যায়। আমি স্যরি বলি, তারপরেও মেয়েটা, ‘এই বেয়াদপটা আমার জুতা খুলে দিসে, এই বেয়াদপটা!’ বলে চেঁচাতে থাকে! মাত্র সেভেনে পড়ুয়া একটা মেয়ে আমাকে বেয়াদপ বলে চেঁচামেচি করে রাস্তায়! বড়দের প্রতি ছোটদের সম্মানের কথা বাদ থাকুক, অন্তত একজন মানুষের কাছে তো আরেকজন মানুষ সম্মান আশা করতেই পারে! সেই সম্মানটা যখন থাকে না, তখন আর মানুষ হয়ে আমাদের আলাদা কী লাভ হলো?

বন্ধুদেরকে গালি দেয়া তো এখন একটা ট্রেন্ডের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে! প্রজন্ম তো বলবে আমি আমার বন্ধুকে গালি দেই, মারি-কাটি, আপনার কী ভাই? আমার কিছুই না। আমাদেরও বন্ধু আছে, আমরাও বন্ধুদের সাথে ফ্রিলি কথা বলি। কিন্তু তার মানে এই দাঁড়ায় না যে বন্ধু রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে আর আমি এক কিলোমিটার দূর থেকে, “অই শুয়োরের বাচ্চা দাঁড়া” বলে চেঁচাবো। এই এক কিলোমিটারের মধ্যে যারা থাকবে তারা ভালো চোখে না দেখবে আমাকে, না দেখবে আমার বন্ধুকে। কিন্তু এই প্রজন্মকে এটা বোঝাবে কে যে অশ্লীল গালি দেয়াই স্মার্টনেস না!

কিছুদিন আগে এক ছেলে (খুব সম্ভবত দশম শ্রেণী পড়ুয়া) প্রোফাইল পিকচার দেয় তার এক মেয়ে বন্ধুর সাথে। সেখানে সে ক্যাপশনে লেখে, “আসলেই একটা খানকি-মাগী”। সেখানে শত শত নেতিবাচক কমেন্টের পরেও ছেলেটার একই উত্তর ছিল, “আমি আমার বন্ধুকে বললে আপনাদের কী?”

এখন কথা হলো ছেলেটা গালি দেয়ার জন্য যেই ভাষাটা ব্যবহার করলো, সেই ভাষাটা কি আদৌ তার বন্ধুর জন্য খুব সম্মানজনক? এই ছবি দেখা কেউ যদি এখন রাস্তায় মেয়েটাকে দেখে এই একই ভাষা প্রয়োগ করে, তখন ছেলেটার কেমন লাগবে? এটা হওয়া তো খুব একটা অসম্ভব ব্যাপার না!

বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষার্থী আরেকটি ছেলে তার মেয়ে বন্ধুদেরকে সবসময় এই ধরণের গালি দিয়েই ডাকে! তার ভাষ্যমতে, “ওরা আসলে এরকমই। ওদেরকে অন্য কিছু বলে ডাকা যায় না”। এমন না যে আমরা জানি না এই শব্দগুলোর মানে কী। তাহলে আমরা প্রিয় বন্ধুকে এই শব্দগুলো পাবলিকলি বলে ডেকে কেন তাদেরকে অপমান করছি? বন্ধুকে গালি দেয়ার অধিকার আমাদের আছে, বন্ধুর সম্মান রক্ষা করার কর্তব্য নেই?

বন্ধুকে যদি খুব গালি দিতে ইচ্ছা হয় তাহলে আমাদের উচিত সেটা সামনাসামনি, ফোনে কিংবা ইনবক্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা। রাস্তাঘাটে, স্ট্যাটাসে কিংবা কমেন্টে এ ধরণের গালি দেয়ার অর্থ হলো এটা বুঝিয়ে দেয়া, “আমি এই নষ্ট প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি। সবাই দেখো আমাকে।”

দিন এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে প্রজন্মটা কোনো দিক দিয়েই পিছিয়ে নেই। আগে অন্তত কলেজপড়ুয়া ছেলেরা মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার চেষ্টা করতো, এখন দেখি ক্লাস সিক্স-সেভেনের ছেলেরাই আমাদের উত্ত্যক্ত করতে চলে আসে! চমৎকার! কত এগিয়ে গিয়েছে নতুন প্রজন্ম; ভাবতেই ঘৃণা লাগে! মুক্তিযুদ্ধের প্রতি এই প্রজন্মের অধিকাংশ ছেলে-মেয়ের বিন্দুমাত্র সম্মান নেই। নেই বঙ্গবন্ধুর প্রতি এক ফোঁটা সম্মান। বঙ্গবন্ধু তাদের কাছে ‘মাথামোটা’ ব্যক্তি! মুক্তিযুদ্ধতে তারা আগ্রহ পায় না। স্বাধীন দেশ পেয়ে গেছি তাই তো যথেষ্ঠ, আবার কীভাবে পেলাম তা নিয়ে এত মাথা ঘামানোর কী আছে?

সময় এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে। সময়ের সাথে সাথে মানুষগুলোর চিন্তাধারাও বদলে যাচ্ছে খুব দ্রুত। আজ আমরা যেভাবে চিন্তা করি, আমাদের বাবা কিংবা দাদারা সেভাবে কল্পনাও করতে পারতেন না। তবে তার মানে এই না পরিবর্তনটা আসবে না; আসুক পরিবর্তন, তাকে সাদরে আমন্ত্রণ। কিন্তু পরিবর্তনটা হোক ইতিবাচক দিক দিয়ে, নেতিবাচক দিক দিয়ে নয়। চিন্তাধারা হোক এত আধুনিক যা আগে কখনো কেউ ভাবতেও পারে নি। কত সমস্যা তো আছে এদেশে; একজন রিক্সাচালক কিংবা রাজমিস্ত্রিকে সম্মান করবে সেরকম মানসিকতা খুব কম মানুষেরই আছে এদেশে। যদি আমরা সেই মানসিকতা অর্জন করতে পারি, আমাদের প্রজন্মের স্বার্থকতা সেখানে।

এত আধুনিক হওয়ার পরও যেকোন কাজেই ছেলেদের ডাকি আমরা, মেয়েদেরকে এখনও ‘তুমি মেয়েমানুষ’ বলে দূরে সরিয়ে রাখি। মেয়েদেরকে মেয়ে মনে না করে মানুষ মনে করলে কি খুব সমস্যা হবে আমাদের? সেটাই কি বরং আধুনিক নয়? চলুন আমরা সবাই মিলে একটু স্মার্ট হই। আমাকে আমার বন্ধুরা আনস্মার্ট-ক্ষ্যাত বলে, কারণ আমি পাউট করে অর্ধেক চেহারার ছবি ফেসবুকে দেই না। আপনিও কি সেই স্মার্টের কথাই ভাবছিলেন? হ্যাশট্যাগ দিয়ে অমুক-তমুক ফেসবুকে দেয়াই বুঝি স্মার্টনেস? মানে আপনি ট্রেন্ডের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে চান, তাই তো? তাই হোক।

আমরা ট্রেন্ডের সাথে তাল মিলিয়েই না’হয় চললাম। আমাদের ট্রেন্ড কেন এমন হয় না যে আমরা কোনো মানুষকে সম্মান দেখাতে না পারি অন্তত অসম্মান দেখাবো না? কেন এমন হয় না যে একটা পথশিশুকে দেখলেই আমরা ধরে নেব না যে এই শিশুটাকে ‘তুই’ বলা ফরজ? কেন আমাদের ট্রেন্ড এমন হয় না যে আজকে থেকে রাস্তায় আমি আর একটা ময়লাও ফেলব না? কেন আমরা মুক্তিযুদ্ধের শিকড়কে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার একটা ট্রেন্ড করতে পারি না? এগুলোকে ট্রেন্ড বানাতে কি লজ্জা লাগে? কই, প্রথম প্রেম, কোন বন্ধু দেখতে বেশি সেক্সি কিংবা ভবিষ্যতে কাকে বিয়ে করব- এই ধরণের কথা ট্রেন্ডের সাথে গা ভাসিয়ে ফেসবুকের ওয়ালে লিখতে তো লজ্জা লাগে না! তা না করে বরং আমরা গালি দেয়ার, মানুষকে অসম্মান করার ট্রেন্ডে গা ভাসাচ্ছি! চমৎকার! একবিংশ শতাব্দী তো চলে এলো, একটুখানি আধুনিক আমরা কবে হব? সবাই মিলে এইটুকু আধুনিক হলেই তো আমরা বলতে পারি, “আমি এই প্রজন্মের গর্বিত প্রতিনিধি। আমি সত্যিকারের আধুনিক।” আর তা না হলে? তা না হলে আর কী! লজ্জায় আমাকে বলতে হবে, “আমি লজ্জিত যে আমি নষ্ট প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি। আমি ভীষণভাবে লজ্জিত। ভীষণভাবে!”

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।