প্রচ্ছদ » বাংলাদেশ » নন্দিত কথাসাহিত্যিক, হুমায়ুন আহমেদ

নন্দিত কথাসাহিত্যিক, হুমায়ুন আহমেদ

প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০১৭৩:০৩:১০ অপরাহ্ন

সুরাইয়া আক্তার জীম

আজ ১৩ নভেম্বর,সোমবার ! ১৯৪৮ সালের এ দিনেই পৃথিবীকে আলো করে জন্ম নেন বাংলা সাহিত্যের জননন্দিত লেখক হুমায়ুন আহমেদ। তিনি বাংলা সাহিত্যকে এক অন্য পর্যায়ে নিয়ে যান। একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং গীতিকার ছিলেন তিনি। বলা হয়, বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের তিনি পথিকৃৎ। নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবেও তিনি বেশ সমাদৃত। তিনি মধ্যবিত্ত জীবনের কথকতা সহজ-সরল গদ্যে তুলে ধরে পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছেন।

হুমায়ূন আহমেদের জন্ম নেত্রকোনার কুতুবপুরে। তার বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে শহীদ হন। মায়ের নাম আয়েশা ফয়েজ। তাঁর বাবার চাকুরী সূত্রে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করেছেন বিধায় হুমায়ূন আহমেদ দেশের বিভিন্ন স্কুলে লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন এবং রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। তিনি পরে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই বিজ্ঞানে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন এবং প্রথম শ্রেণীতে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি মুহসীন হলের ৫৬৪ নং কক্ষে তার ছাত্রজীবন অতিবাহিত করেন। পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়ন বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি লাভ করেন।

১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতোমাদের জন্য ভালোবাসা রচনা করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। লেখালেখিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় একসময় তিনি অধ্যাপনা ছেড়ে দেন৷ শিক্ষক হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন এই অধ্যাপক৷

১৯৭২ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস নন্দিত নরকে দিয়েই হুমায়ূন আহমেদ কথাসাহিত্যে পালাবদলের তাত্পর্যপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এরপর একের পর এক উপন্যাসে পাঠকের কাছে নন্দিত হয়ে উঠেছেন অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা নিয়ে। আমৃত্যু সেই জনপ্রিয়তার স্রোতে ভাটার টান পড়েনি।

হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসংখ্য লেখাই শুধু লিখেন নি বরং বানিয়েছেন বহু সিনেমা । বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে কয়টি চমৎকার উপন্যাস রয়েছে, তার মধ্যে হুমায়ুন আহমেদের লেখা এবং তার চলচিত্র অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। আগুনের পরশমনির মত চলচিত্র যেমন লক্ষ লক্ষ দর্শককে কাঁদিয়েছে, তেমনি তার উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্র বাঙালী হৃদয়ে এখনও গেঁথে আছে । হিমু আর মিসির আলীর মত জনপ্রিয় এবং অনন্য চরিত্র সৃষ্টিও বাংলাদেশের পাঠকের মধ্যে আলোড়ন তুলেছে।

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দুই শতাধিক গল্পগ্রন্থ ও উপন্যাস রচনা করেছেন। তাঁর রচনার প্রধান কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্যতম হলো ‘গল্প-সমৃদ্ধি’। এছাড়া তিনি অনায়াসে ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে অতিবাস্তব ঘটনাবলীর অবতারণা করেন যাকে একরূপ যাদু বাস্তবতা হিসেবে গণ্য করা যায়। তাঁর গল্প ও উপন্যাস সংলাপপ্রধান। তাঁর বর্ণনা পরিমিত এবং সামান্য পরিসরে কয়েকটি মাত্র বাক্যের মাধ্যমে চরিত্র চিত্রণের অদৃষ্টপূর্ব প্রতিভা তাঁর রয়েছে। যদিও সমাজ-সচেতনতার অভাব নেই তবু লক্ষ্যণীয় যে তাঁর রচনায় রাজনৈতিক প্রণোদনা অনুপস্থিত। সকল রচনাতেই একটি প্রগাঢ় শুভবোধ ক্রিয়াশীল থাকে; ফলে ‘নেতিবাচক’ চরিত্রও তাঁর লেখনীতে লাভ করে দরদী রূপায়ণ। বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে হুমায়ুন আহমেদ যে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র, এতে কোন সন্দেহ নেই।

হুমায়ুন আহমেদ তাঁর অসংখ্য বহুমাত্রিক সৃষ্টির জন্য নানা পুরস্কারে ভূষিত হন- বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৮১) শিশু একাডেমী পুরস্কার একুশে পদক (১৯৯৪) জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ কাহিনী ১৯৯৪, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ১৯৯৪, শ্রেষ্ঠ সংলাপ ১৯৯৪) লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩) মাইকেল মধুসুদন পদক (১৯৮৭) বাচসাস পুরস্কার (১৯৮৮) হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০) জয়নুল আবেদীন স্বর্ণপদক ২০১২ সালের ১৯ জুলাই এই নন্দিত কথাসাহিত্যিক কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের বুলভিল হাসপাতালে পৃথিবীকে চিরবিদায় জানান। সকলের মাঝে হাহাকার সৃষ্টি করে রাত ১১:২০ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যগ করেন । তাঁকে নুহাশ পল্লীতে দাফন করা হয়।

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।