প্রচ্ছদ » বাংলাদেশ » তাদের জীবনযাত্রা আমাদের থেকে সম্পূর্ন ভিন্ন

তাদের জীবনযাত্রা আমাদের থেকে সম্পূর্ন ভিন্ন

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০১৭৫:২১:৪৬ অপরাহ্ন

আমার বাবা খুব আরামপ্রিয় মানুষ। সব কিছুতে আরাম খোঁজে সে। অফিস থেকে এসে যদি সে তার বিছানা ঠিকঠাকমতো গোছানো না পায় তো তার মেজাজ সপ্তমে উঠে যায়! আবার অন্য কারো বাসায় গিয়েও সে ঘুমাতে পারে না। নিজের বিছানা, নিজের রুম ছাড়া নাকি তার ঘুম আসে না!

কয়েকমাস আগে একটা দৃশ্য দেখে বাবার কথা মনে হলো। একই দেশে থাকি আমরা, মাত্র ৫৬ হাজার বর্গমাইলের মধ্যেই তো ষোলো কোটির বেশি মানুষের বসবাস, অথচ প্রতিটি মানুষের জীবনযাত্রা আলাদা। আমাদের জীবনযাত্রা আর আমার সামনে থাকা মানুষগুলোর জীবনযাত্রায় যেন আকাশ-পাতাল তফাত!

ভাবছেন নিশ্চয়ই কী এমন দেখেছিলাম সেদিন? অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখেছিলাম। আমার সামনে ছিল বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা, মাঠই বলা যেত যদি মাঝখানে মাঝখানে পাকা রাস্তা না থাকতো। সেই জায়গায় কোথাও কোথাও জলাশয়, কোথাও আবার শুকনো। শুকনো স্থানগুলোর অনেকটা অংশ দখল করে আছে তাবুর মতো ছাপড়া কিছু ঘর। কালো পলিথিন দিয়ে বানানো ছোট্ট একটা অস্থায়ী ঘর, যেই ঘরে দাঁড়ানো পর্যন্ত যায় না! আক্ষরিক অর্থেই শুধুমাত্র মাথা গোঁজার ঠাই সেটা।

সাপুড়ে জীবন

জায়গাটা বৃন্দাবন। রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএসের ভিতর দিয়ে চলে আসা যায় এই বৃন্দাবনে। বৃন্দাবন থেকে আবার খুব সহজেই চলে যাওয়া যায় উত্তরা দিয়াবাড়ি। কয়েকমাস আগে একবার ঠিক করলাম বৃন্দাবন যাব। ব্যাস, দলবল নিয়ে একদিন বেড়িয়েও পড়লাম! আমি, সবুজ ভাই, বাপ্পি ভাই ও শ্রাবন্তী আপু।

ডিওএইচএসের ভিতর দিয়ে বৃন্দাবনের কাছে এসে সরু একটা রাস্তা নিচের দিকে চলে যায়। সেই রাস্তার উপরে মিরপুর ডিওএইচএস আর নিচে বৃন্দাবন। নামার সাথে সাথে হুট করে একটা ধাক্কা লাগে বুকে! দৃশ্যপট পুরোপুরি ভিন্ন! এইমাত্র যেই নাগরিক পরিবেশে ছিলাম আমরা, মুহূর্তেই যেন কোনো যাদুমন্ত্রবলে তা পরিবর্তন হয়ে গেছে! সামনে এখন পুরোপুরি গ্রাম্য পরিবেশ, গ্রাম্য একটা বাজার। গ্রাম গ্রাম গন্ধ চারদিকে। অদ্ভুত লাগে দেখতে। ডানপাশে বিশাল বিশাল দালান আর বামপাশে দরিদ্র কিছু মানুষ বাজারে তরকারি বিক্রি করছে। শুধুমাত্র একটা দেয়ালের ব্যবধান। শহরের আধুনিকতার ছোঁয়া যেন এদেরকে কোনোভাবেই স্পর্শ করে নি! এই দৃশ্য দেখে সবুজ ভাই সঙ্গে সঙ্গে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের একটা লাইন বলে উঠলেন, “ঈশ্বর থাকেন ভদ্রপল্লীতে!”

বাজার পেরিয়ে সামনে গেলাম আমরা। ধীরে ধীরে মানুষজন কমে এলো। নিরব একটা জায়গায় পোঁছে গেলাম। চারদিকে ফাঁকা, পুরোপুরি ফাঁকা জায়গা। যতদূর চোখ যায় শুধু আকাশ আর আকাশ। ঢাকা শহরে এ দৃশ্য কল্পনাও করা যায় না। কিছু কিছু জায়গায় জলাশয়। ওখানে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা গোসল করছে। কী হাসি তাদের মুখে!

সামনে হেঁটে গেলে বিচ্ছিন্ন কিছু ছাপড়া ঘর পাওয়া যায়। নিজেদের মতো করে সুখী তারা। ওইটুকু ঘরে প্রয়োজনীয় সবকিছু সাজিয়ে নিয়েছে। আবার সৌর প্যানেল দিয়ে বিদ্যুতের ব্যবস্থাও করে নিয়েছে।

আরও সামনে গেলাম। দেখলাম অনেকগুলো ছোট ছোট ঘর। কালো পলিথিন দিয়ে তাবুর মতো করে বানানো। তারপরের ঘটনা তো আপনারা জানেনই!

অবাক ঘটনা হলো ঘরগুলোর বাইরে অনেকগুলো বানর। গলায় শিকল বাঁধা সবগুলো বানরের। শান্তভাবে বসে আছে। কয়েকজন নারী বাইরে রান্না করছে। একটু সামনে গেলাম। আর এর মধ্যেই ঘটলো এক ঘটনা! আমাকে বাগে পেয়ে সেই শান্ত বানর আর শান্ত থাকলো না, হয়ে উঠলো অশান্ত! হুট করে কামড়ে ধরলে আমার জামায়! ঘটনার আকস্মিকতায় কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল আমার বুঝতে যে কী হচ্ছে, আর তারপরই নিজেকে ছাড়ানোর জন্য তৎপর হয়ে উঠলাম! কোনোমতে ঘাতক বানরের কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করে দিলাম দৌড়! একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখি সে পিটপিট করে আমার দিকে তাকাচ্ছে। দেখে মনেই হয় না এতবড় ঘাতক এই ব্যাটা!

রান্নায় ব্যস্ত এক সাপুড়ে বউ এর সাথে কথা বলছে লেখক

আমার আতঙ্ক দেখে রান্না করতে থাকা এক নারী বলেন, “এত ভয় পাওয়ার কিছু নাই। বান্দরের কত কামড় খাইলাম জীবনে! আমার পোলার তো সারাবছরই হাত-পায়ে কামড়ের দাগ থাকে।”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনাদেরও কামড়ায়?”
তিনি নির্বিকার মুখে বললেন, “হ। শুধুমাত্র আমাদের সর্দারের কথা শোনে। তাছাড়া আমাগো কারোর কথা শোনে না। আর আপনি এত ভয় পাইতেছেন ক্যান? কামড়াইলে কিছু হয় না, শুধু মাঝেমধ্যে একটু মাংস বাইর হয়ি যায় (!)”।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, নাম কী এই বানরের?
তিনি বললেন, “বান্দরের নাম বান্দর! বান্দরের আবার নাম কী হবে! তবে আদর করি মাঝে মাঝে সাদু ডাকি।”

আমি ঘাতক সাদুর দিকে তাকালাম। এই ঘাতককে আবার আদরের নামও দিয়েছে! বাব্বাহ!

রান্নারত ওই নারীর থেকে অনেক তথ্য পেলাম। ওনার নাম মোসাম্মাদ খাদিজা, গ্রামের বাড়ি যশোর। যেই সময়ের ঘটনা ওই সময়ে দেশে বন্যা ছিল। মোসা. খাদিজাদের গ্রাম কালীগঞ্জও ভেসে গিয়েছিল বন্যায়। তাই বেঁচে থাকার তাগিদে তারা ঢাকায় এসে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের দলের সর্দারের নির্দেশে বন্যা নামলে আবারও তারা ফিরে যাবেন।

সর্দারের ব্যাপারটা আমি ঠিক বুঝতে পারি নি। উশখুশ করছিলাম জানার জন্য ঘটনাটা কী। কিন্তু তার আগেই তিনি নিজেই জানিয়ে দিলেন তারা সাপুড়ে। সাপ ধরা যাদের পেশা!

মোসা খাদিজার ভাষ্যমতে, তাদের জাতের ছেলেরা বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গা থেকে সাপ ধরে। একেক মৌসুমে দেশের একেক জায়গায় থাকেন তারা। আর যখন গ্রামে থাকেন তখন বানরের খেলা দেখিয়ে আয় করেন। যে যা দেয় তাই দিয়েই কষ্ট করে চলতে হয় তাদের। এ ছাড়া আর কোন পথ যে খোলা নেই! এখন তারা জীবন নির্বাহ করছেন জমানো টাকায়।

মোসা. খাদিজার প্রতিটি কথাতেই বোঝা যায় তারা তাদের দলের সর্দারের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। সর্দারের কথায় ঘরবাড়ি ফেলো এতদূরে যাযাবরের মতো থাকতে এসেছেন, আবার সর্দার যেদিন বলবেন সেদিনই তারা ফিরে যাবেন। সর্দার তাদের সম্পর্কে সকল সিদ্ধান্ত নেন। এতগুলো মানুষের ভার যার ওপর, তাকে দেখতে ইচ্ছা হলো খুব। একজন লোক সেই সুযোগ করেও দিলেন! বললেন, “আসেন আপনাকে সর্দারের সাথে দেখা করায়া দেই”। সর্দার শুনলেই মনের মধ্যে কেমন যেন বলশালী এক লোকের চেহারা ভেসে ওঠে। কিন্তু এই সর্দারের সাথে আমার কল্পনায় দেখা সর্দার একেবারেই মিললো না! ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ, কাঁচাপাকা চুল, পান খাওয়া দাঁত আর চোখে-মুখে চিন্তার পাকাপাকি ছাপ – এই হলো সর্দারের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য। নাম মো. নুরুল ইসলাম। ১৭ বছর ধরে তিনি এই দলের সর্দার। সাপুড়েদের সর্দার নির্বাচিত হয় বংশ পরম্পরায়, তিনিও ১৭ বছর আগে তাই হয়েছিলেন। তিনি তাদের সম্পর্কে বলেন, “আমাদের সাতটা জাত আছে। এই যে আমাদের দেখতেছেন, আমরা সাপুড়ে। আমরা শুধু সাপ ধরি। এই সাপ নিয়ে কেউ কেউ ওষুধ বানায়, কেউ খেলা দেখায়। তাদের মধ্যে বেদে আছে, বাইদ্যা আছে।”

সাপুড়ে সর্দার এর সাথে কথা বলছে লেখিকা

সাপ ধরতে গিয়ে কখনো কোনো দূর্ঘটনা ঘটেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, অনেকবার সাপের কামড় খেয়েছেন। একবার তো প্রায় মরতে বসেছিলেন। তখন তার সঙ্গীরা তাকে আক্রান্ত স্থানে স্তক মনিরাজ গাছের রস লাগালে প্রাণে বেঁচে যান। সেই গাছও আবার বাংলাদেশে পাওয়া যায় না, ভারত থেকে আনতে হয়। ভারতেও তাদের লোক আছে।

তিনি বলেন, “বুঝলেন, এই পেশায় সাহসই সব। সাপে কামড়াইবই। তাই বইলা বইসা থাকলে কিংবা ভয় পাইলে চলব না”।

এসময় নুরুল ইসলামের পাশে দাঁড়ানো এক লোক বলেন, “আমাদের জাতের অনেকে এখন লেখাপড়া শিখে, বড় অফিসার হয়। আমি হইনাই, আমাগো ছেলেমেয়েরেও লেখাপড়া শিখাই নাই। তাহইলে আমাগো পেশায় লোক কইমা যাইবো। এই পেশায় লোক দরকার আছে।”

কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। যাওয়ার সময়ও চলে এলো। ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে লাগলাম আমরা, আর পিছিয়ে যেতে লাগলো নীল আকাশ ছেয়ে যাওয়া রক্তিম আভা। শুধুমাত্র একটা দেয়ালের দূরত্ব, তারপর আবার সেই নাগরিক কোলাহল, যান্ত্রিক জীবন। পেছন ফিরে তাকালাম। কষ্ট হলো খুব। সুবিশাল অ্যাপার্টমেন্ট সিটি হবে এখানে। আর কোনো শিশু হাসতে হাসতে জলাশয়ে ঝাঁপ দেবে না, আর কখনো কাশফুলে ছেয়ে যাবে না জায়গাটা। তখনও এভাবেই সূর্য ডুববে পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্যকে এক করে, কিন্তু দেখার কেউ থাকবে না। আধুনিক নাগরিক জীবনে আমাদের এত সময় কই? সবাই ভীষণ ব্যস্ত আমরা!

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।