প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » সম্পাদকীয় » ছাত্র রাজনীতিকে ইচ্ছে করে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে?

ছাত্র রাজনীতিকে ইচ্ছে করে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে?

প্রকাশ : ১ ডিসেম্বর ২০১৭৯:০৮:২৭ অপরাহ্ন

“এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়,
এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।”

না মানে, বলছিলাম ছাত্রদের রাজনীতি সম্পৃক্ততার কথা। এতটুকু পড়েই যদি আঁতকে উঠেন তাহলে লেখাটা আপনার জন্যই।

ছাত্র রাজনীতি। কথাটা শোনা মাত্রই আমাদের সবার চোখে প্রায় একই দৃশ্য ভেসে উঠে। কমবয়সী ছেলেপিলের একটা দল বিভিন্ন রকমের অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে কোন একটি রাজনৈতিক দল। আমরা সভ্য বিবেকবান মানুষেরা ওসবের মধ্যে যাই না। কোন ভদ্রলোকে আজকাল রাজনীতি করে নাকি? আর ছাত্র রাজনীতি? ওসব গুন্ডাপান্ডাদের কাজ। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের এইসব সন্ত্রাসের আঁচ স্কুল কলেজের কোমলমতি ছেলেমেয়েদের গায়ে লাগবে, এ তো ভাবাও যায় না!

আচ্ছা আসুন আমরা ২০১৭ সাল থেকে একটু পিছিয়ে যাই। চলে যাই ১৯৭১ সালে। জানেন তো, বাংলাদেশ নামের একটা দেশ স্বাধীন হল সে বছর। মুক্তিযুদ্ধ নামের একটা “রাজনৈতিক যুদ্ধ” এর মাধ্যমে। এই “রাজনৈতিক যুদ্ধে কাদের সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণ ছিল জানেন তো? এই অল্পবয়সী ছেলেদেরই। শহীদুল ইসলাম লালু নামে যিনি সর্বকনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তার বয়স ছিল ১৩ বছর। এই ১৩ বছরের ছেলে লালু কাজের লোকের ছদ্মবেশে পাকিস্তানী ক্যাম্পে ঢুকে একদম ক্যাম্পের ভিতর গ্রেনেড বিষ্ফোরণ ঘটিয়ে ফেলেন। তার এই দুঃসাহসিক অভিযানে পাকিস্তানী সেনা এবং তার সহযোগী সহ মোট আটজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়। মনে আছে তো ছেলেটার বয়স কত ছিল? ১৩। হাল আমলে জন্মালে ক্লাস সেভেনে পড়ত। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানকে চিনেন নিশ্চই! ধলাই সীমান্ত চৌকির যুদ্ধে শহীদ হওয়া ছেলেটার বয়স ছিল ১৮ বছর। এই বয়সে আজকালকার ছেলেমেয়েরা কলেজে পড়ে। এরকম অসংখ্য অসংখ্য উদাহরণ আছে “কোমলমতি” ছেলেমেয়েদের বীরত্বের।

আচ্ছা আসুন এবার আমরা একজন নেতার গল্প শুনি। এই নেতা ১৯৩৯ সালে যখন মিশনারি স্কুলে পড়তেন তখন থেকেই রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৪০ সালে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন এবং এক বছরের জন্য নির্বাচিতও হন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সক্রিয় ছাত্র নেতা ছিলেন, রাজনৈতিক কারণে বহিঃষ্কার হয়েছিলেন, ৫৫ বছরের জীবনে প্রায় ১৪ বছরই কারাগারে কাটিয়েছেন, তারপর সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে একটা দেশ স্বাধীন করেছেন। এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গিয়েছেন কার কথা বলা হচ্ছে। ঠিক ধরেছেন। ইনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

পাঠক এতক্ষণে যথেষ্ট বিরক্ত হয়েছেন বোঝা যাচ্ছে। প্রথমত এসব তথ্য সবারই কমবেশি জানা। দ্বিতীয়ত দেশের যুদ্ধবস্থায় যা স্বাভাবিক ছিল স্বাধীন দেশেও সেটা স্বাভাবিক হবে কেন? আমি আপনার সাথে একমত। আমরা স্বাধীন হয়েছি ৪৬ বছর হতে চলেছে। শিক্ষা- দীক্ষায়, জ্ঞানে- প্রজ্ঞায়, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, কৃষি, যোগাযোগে আমাদের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। আমাদের ছেলেমেয়েদের সামনে এখন নিশ্চিত ভবিষ্যত আছে, দেশে কিছু করতে না পারলে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ আছে, হাতে হাতে তথ্য- যোগাযোগ প্রযুক্তি আছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আছে, বোমাবাজি, হরতাল, অবরোধ এই দেশের মানুষ বহুদিন দেখেনি, একসময় আমরা শরণার্থী ছিলাম কিন্তু আমরা এখন শরণার্থী আশ্রয় দেই; আপাতঃদৃষ্টিতে আমরা আগের চেয়ে অনেক ভালো আছি। এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। এখন কেন খামোখা আমাদের ছেলেমেয়েরা রাজনীতিতে যাবে আর কেনই বা শুধু শুধু নিজেদের সুন্দর ভবিষ্যতকে নষ্ট করবে? একটা সময় স্কুল- কলেজ লেভেলে রাজনীতির দরকার ছিল। এখন তার আর কী দরকার?

গত কয়েক বছর বেশ কিছু প্লাটফর্মে কাজ করার, কাজ না করলেও শুভানুধ্যায়ী হয়ে তাদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। সিংহভাগ প্লাটফর্মই স্কুল কলেজ পড়ুয়া তরুণ ছেলেমেয়েদের। এই স্বল্প সময়ে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তা কিন্তু মোটেও সুখকর নয়। এই প্রজন্ম জিপিএ ৫ পায়, দেশি বিদেশি গ্যাজেট তাদের নখদর্পনে থাকে, সোশ্যাল মিডিয়ায় শত শত লাইক আর হাজার হাজার ফলোয়ার থাকে, এই প্রজন্মের তথ্য জানতে কষ্ট করে বই পড়তে হয় না- গুগল আছে তো! জ্ঞান বিজ্ঞানের বিশাল দুয়ার খোলা তাদের সামনে। বিগত যে কোন জেনারেশনের চেয়ে তারা অনেক বেশি সামনে এগিয়ে।

কিন্তু মুদ্রার ওপিঠও আছে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি প্রজন্ম নিজের জন্ম ইতিহাস জানে না, ইন্টারমিডিয়েট পড়ুয়া শিক্ষার্থীকে বলতে শুনেছি ভাষা আন্দোলন হয় ১৯৪৮ সালে, নবম শ্রেনী পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা ক্র্যাকপ্লাটুনের নাম শোনেনি কখনো। বেশিরভাগ ছেলেমেয়ের দেশ নিয়ে কোন ভাবনা নেই, মানুষের জন্য কিছু করার তাগাদা নেই, সব বাদ দিয়ে সামান্য ন্যায়- অন্যায় বোধটাও নেই।

আসলে সত্যি বলতে, এই অবস্থা কিন্তু আজকে নতুন নয়। এটা সবসময়ই ছিল। তবুও সব জেনারেশন থেকেই কেউ না কেউ উঠে এসেছে সামনে হাল ধরার জন্য। দুঃসময়ে কেউ না কেউ সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিল…..  হ্যাঁ “দিয়েছিল”। এই “দিয়েছিল” টা বহুদিন হয় “দিচ্ছে” হয়ে উঠেনি। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর- প্রজন্ম থেকে কোন নেতা দেখে নি। পূর্ববর্তী যোগ্যদের অযোগ্যরা গায়ের জোরে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করে নিয়েছিল, তারপর আর কোন যোগ্যের জন্ম হয় নি।

জন্ম হয় নি, কারণ হতে দেওয়া হয় নি। গোটা ব্যবস্থাটাকে সুকৌশলে পঁচিয়ে ফেলা হয়েছে। বন্ধ্যা বানিয়ে রাখা হয়েছে। যাতে নতুন কাউকে জন্ম দিতে না পারে।

এই বন্ধ্যাকরণের একটা অংশই আসলে ছাত্র রাজনীতিকে দূষিত করে ফেলা। “ভালো ছেলেরা” আজকাল রাজনীতিতে যায় না। যারা যাচ্ছে তাদেরও আসলে আদর্শিক কোন ভিত্তি নেই। অনেকটা ঝোঁকের মাথায় যাচ্ছে। ঝোঁক কেটে গেলে সরে পড়ছে। সাংগঠনিক দক্ষতা, নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষমতা, ফলপ্রসু উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষমতা- এসব কয়জনই বা রাখে?

ধান ভানতে শীবের গীত হয়ে যাচ্ছে কি? স্কুল কলেজে ছাত্র রাজনীতির সাথে এসবের সম্পর্ক কী? সম্পর্ক আছে মশাই! একটু আগেই বলেছিলাম স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের নিয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা। এই ছেলেমেয়েদের কেউ কেউই হয়ত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গিয়ে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হবে। কোনরকম আদর্শিক ভিত্তি ছাড়া যখন কেন ছেলে বা মেয়ে কেবলমাত্র ঝোঁকের মাথায় রাজনীতিতে ঢুকে যাবে তখন আপনি তার কাছ থেকে কী আশা করবেন? যোগ্য নেতৃত্ব নাকি কেবল অন্ধ অনুকরণ? আজকাল অভিজ্ঞতা ছাড়া চাকরির বাজারেও দাম পাওয়া যায় না, অনভিজ্ঞ লোকের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার ভার কী করে দেবেন বলুন?

নেতৃত্ব জিনিসটা অনেকটাই চর্চার বিষয়। জ্ঞান, নীতি, আদর্শ দিয়ে বুদ্ধিজীবী হওয়া যায়। নেতা হওয়া যায় না। একজন নেতা তৈরি হতে অনেক সময় লাগে। অনেক অভিজ্ঞতা লাগে। আর এই অভিজ্ঞতা আসে মাঠপর্যায়ে কাজ করে। শুধু বইপত্তর পড়ে যদি নেতা হওয়া যেত তাহলে দেশের সবাই নেতা হয়ে যেত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে গ্র্যাজুয়েটের তো অভাব নেই। শুধু পুঁথিগত বিদ্যার ভয়াবহতা টের পাওয়া যায় পাঠ্যবইয়ে ছোটবেলা থেকে ইতিহাস শেখানোর পরেও বেশিরভাগ ছেলেমেয়ের ইতিহাস সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞানও না থাকার বিষয়টা থেকে। পড়াশোনার দরকার অবশ্যই। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে কাজ করারও অভিজ্ঞতা দরকার।

ক্ষমতাসীন দল স্কুল পর্যায়ে কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য যে সাধু নয় সেটা বোঝা কষ্টকর না। এভাবে চালু হলে ছাত্র রাজনীতির নামে সন্ত্রাস ঢুকে পড়বে এটাতে কোন সন্দেহ নেই। নিবেদিতপ্রাণ কর্মী তৈরি তাদের উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য আরো কিছু ক্যাডার তৈরি করা। একে সমর্থনের কোন কারণ নেই।

কিন্তু চাইলেই বিষয়টা অন্যরকম হতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলো স্কুল- কলেজ লেভেলের ছেলেমেয়েদের রাজনৈতিক সচেতনতার দায়িত্বটা নিতে পারে চাইলেই। সেরকম সিরিয়াস কিছু তো আর না….. আদর্শিক প্রচার, দেশ- দেশের ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন করা…… এই তো! সক্রিয় রাজনীতি না হোক, আদর্শিক চর্চা তো চলতেই পারে। স্কুল কিংবা কলেজের ছেলেমেয়েদের কোন নির্দিষ্ট দল করতে হবে, ধর্মঘট- মিছিলে যোগদান করতে হবে, তা তো আর না। কিন্তু দরজাগুলো খোলা থাকুক। ঘরের পাঁচটা দরজা খোলা থাকলে পাঁচটা দরজা দিয়ে পাঁচ রকমের পথের সন্ধান পাওয়া যাবে। কে কোন পথে চলবে এবং কখন চলা শুরু করবে সেটা নাহয় তার উপরই ছেড়ে দেওয়া হোক। কিন্তু দরজাগুলো যখন খোলা থাকবে তখন কেউ না কেউ তো কখনো না কখনো কোন একটা পথ ধরে চলা শুরু করবেই। কিন্তু যতক্ষণ দরজা বন্ধ থাকবে ততক্ষণ সে আশা দূরাশা!

ব্যাপারটা শুরু হোক। কিন্তু এভাবে নয়। ভিন্নভাবে। শুভ উদ্দেশ্যে। দেশের ভবিষ্যত নেতৃত্ব তুলে আনার লক্ষ্যে। নইলে কিন্তু আর বিশ বছর পরে এদেশের হাল ধরার মত আর কাউকে পাওয়া যাবে না।

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।