প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » অতিথি কলাম » বাবা-মা ভালো না !!

বাবা-মা ভালো না !!

প্রকাশ : ৬ ডিসেম্বর ২০১৭৯:০১:৩০ অপরাহ্ন

তুষপি ইসলাম ঝুমা
বর্তমানের ছেলে-মেয়ে রা প্রায়ই এই অভিযোগ করে থাকে , তাদের আব্বু আম্মু নাকি তাদের ভালোবাসে না। এটা নিয়ে তাদের মনের ভেতর অনেক ক্ষোভ , খারাপ লাগা এবং অনেক ধরনের হীন মনতা কাজ করে।

কিন্তু আমরা কি কখনো এভাবে ভেবেছি যে, একটা মানুষের জীবনে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস টি হচ্ছে সময় এবং এটা যে কখনোই, যে কোন কিছুর মূল্যে ফিরে পাওয়া যায় না সেটা আমরা সকলেই খুব ভালো ভাবে জানি। আর প্রতিটি বাবা-মা ই তাঁদের জীবনের পুরো সময় টা তাদের সন্তানদের পেছনে, সন্তানদের মানুষ করতে ব্যয় করেন।

একজন মা হয় তো প্রতিদিন রান্না করেন , ঘর গোছান, ঘরের যাবতীয় কাজ গুলো করেন যেমন টা বাঙালী সংস্কৃতিতে আগে থেকেই হয়ে আসছে, কিংবা বাবা-মা দুজন ই চাকরী করলেও তাঁরা চাকরী টা করেন টাকার জন্য, তাঁদের সন্তানদের খরচ , ব্যয় বহন করার জন্য, সন্তানদের চাহিদা, ইচ্ছা পূরণ করার জন্য এবং এসব করতে কিন্তু তাঁদের শ্রম ও সময় দুটোই ব্যয় হয়। একজন বাবা-মায়ের একদিনের রুটিন টা ঘুরে আসলে সব শেষে দেখা যাবে তাঁর সার্বক্ষণিক কাজের উদ্দেশ্য একটাই , তাঁদের সন্তানদের ভাল রাখা ।

তাঁরা হয় তো এই সময় টা অন্য কোন ভাবে , নিজেদের কাজে কাটাতে পারতেন। তাঁরা ও তো মানুষ , তাঁদের ও তো কত ধরনের ইচ্ছা হতেই পারে, একটু আধটু বিলাসিতা করার ইচ্ছা জাগতেই পারে, তাদের ও অনেক রকম ভালো লাগা , শখ থাকতে পারে। কিন্তু তাঁরা সেই সব কিছু একদিকে ঠেলে দিয়ে সন্তানের প্রয়োজনটাকেই আগে দেখেন।

তুমি যেমন বন্ধুদের সাথে ঘুরতে, আড্ডা দিতে পছন্দ করো, হ্যাং আউট করো, তাঁরা ও চাইলে এমনটা করতেই পারেন। কিন্তু একটু ভেবে দেখো তো তারা বছরে কদিন ঘুরতে যান? কদিন ফ্রেন্ডদের সাথে আড্ডা দেন, হ্যাং আউট করেন ?

নিজেকে একবার তাঁদের জায়গায় বসিয়ে ভাবো তো, তুমি কি এইসব স্যাক্রিফাইস গুলো করতে পারতে ? সারাদিন দিন গাধার মত খেটে টাকা ইনকাম করবে , আর সেই টাকা সন্তানের প্রয়োজনে ব্যয় করবে; কিংবা সারাদিন রান্না ঘরে ঘেমে রান্না করবে, ঘর মুছবে, জামা কাপড় ধুবে শুধু সন্তানকে ভালো থাকার জন্য, ভালো রাখার জন্য। পারবে?আদৌ কি এইসবের কোন বিনিময় প্রথা আছে? তুমি কি তোমার বাবা- মাকে এই সবের বিনিময়ে কিছু দিচ্ছো ?  অথচ বাইরে থেকে ঘুরে আসো তো কোন ফ্রেন্ড কিংবা অন্য কেউ কি তোমাকে ৫ টা টাকা দিবে কোন কারণ ছাড়া?

না দিবে না, আরে ভাই আমরা যে ভিক্ষুক কে ভিক্ষা দিই তাতেও কারণ আছে, ভিক্ষুক কে ভিক্ষা দিলে সে আমাদের জন্য দোয়া করবে, আমাদের মনের আশা পূরণ হবে। পরীক্ষায় পাশ হয়ে যাবার জন্য যে ব্যক্তি জীবনে একটাকা ও ভিক্ষুক কে দেয় নি, সেও ১০ টাকা দিয়ে দেয়। পৃথিবীর সব কিছুইতেই বিনিময় প্রথাটা আছে একমাত্র বাবা-মা ব্যতীত ।

আর চাকরী করা কিন্তু মুভির মত এসি রুমে বসে কোর্ট টাই পরে কিছু সই দিলেই বাহবা মিলবে টাকা ইনকাম হবে তেমন টা না , মুভি তো মাত্র ২/৩ ঘন্টার, কিন্তু এক দিন সমান ২৪ ঘন্টা আর একজন বাবা-মা কে তার জীবনের রোজই চাকরী করতে হয়। হাজারো লোকের ফুড ফরমাইশ খাটতে হয়, ঝাড়ি খেতে হয়। তাছাড়া রোজ রোজ পরিবারের প্রতিটা সদস্যের রুচি মত আলাদা আলাদা রান্না করা মাস্টার সেফের মত এত মজার কাজ না। কিংবা টেলিভিশনের এড এর মত চাকা হুইল পাউডার দিলাম আর এক নিমিষেই জামার ময়লা দূর তাও কিন্তু না । তুমি কিন্তু অল্পেই বিরক্ত হয়ে যা, কিন্তু তোমার আব্বু আম্মু রোজ একই কাজ করছেন, বিরক্ত তারাও হচ্ছেন কেননা তারাও তো মানুষ। তবু তারা তাদের দায়িত্ব গুলো করে যান। কারণ ওই যে তাঁরা তোমার বাবা-মা, তাঁরা তোমাকে ভালোবাসেন। জীবন তো একটাই কিন্তু সেই এক জীবনের সবটুকু সময় ই বাবা-মা রা তাঁদের সন্তানদের ভালো রাখার জন্য দেন।

বাবা-মা অনেক সময় শাসন করলে প্রায় ছেলে মেয়েই এটা নেগেটিভলি নেয় , বাবা- মা ভালো না, বেশি রাগী ইত্যাদি বিভিন্ন কটুক্তি করে বসে। কিন্তু তুমি কি কখনো এভাবে ভেবেছো, তোমার বাবা-মা তোমাকে শাসন করবে নাতো কাকে করবে ? পাশের বাসার বাচ্চাকে?

তোমার যখন রাগ হয় তুমি তো সেটা তোমার বাবা-মা কে দেখাতে পারো, তাহলে কেনো তাঁরা তাঁদের রাগটা তোমাকে দেখাতে পারবেন না?  তাছাড়া তোমার যেমন সবচাইতে কাছের মানুষ তোমার বাবা-মা, তোমার বাবা-মায়ের কাছেও সবচাইতে কাছের মানুষ তাঁদের সন্তান, তাই তাঁরা রাগ , শাসন দেখাতেই পারেন আদরের পাশাপাশি।

তাছাড়া বাবা-মা রা নাকি তাঁদের ছেলেমেয়েদের বুঝেন না এমন অভিযোগ ও করে থাকে। কিন্তু ছেলেমেয়েদের ভাষায় আসলে বুঝা বলতে কি বুঝাতে চায় সেটা জানা প্রথমে দরকার। এখন এই বুঝা বলতে যদি সব রকমের আবদার রাখতে হবে, সবকিছুতেই সম্মতি জানাতে হবে তাহলে আমি বলবো এই বুঝাটা না বুঝাই উচিত বাবা- মা দের। এতে সন্তানের জন্যই মঙ্গল।

দিন পাল্টাচ্ছে , সাথে চারপাশ; আজ থেকে ১০ বছর আগে ছেলেমেয়েরা বন্ধু হতে পারতো না, সমাজ এটাকে খুব বাজে চোখে দেখতো, তাছাড়া এই এখন আর আগেকার তখন এর মাঝে অনেক পার্থক্য এবং তোমাদের বাবা-মা কিন্তু সেই ১০ বছর আগের চারপাশ টা থেকেই এই বর্তমানে এসেছেন। তাদের বাবা-মা অর্থাৎ তোমাদের নানু-দাদু তাদের এভাবেই বড় করেছেন, তাই সেই নিয়ম নীতি, শিক্ষাটা তারা তোমাকেও দিতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক।

তোমাকে দিয়েই ভাবো না, তুমি কি আমেরিকা গিয়ে ওদের সংস্কৃতি ধারণ করতে পারবে? রেগুলার এলকোহল নিতে পারবে? এলকোহল নিয়ে আমেরিকানদের মত প্রতিদিনকার কাজ গুলো করতে পারবে? ওয়েস্টার্ণ ড্রেস পরতে পারবে? পারবে না, সময় লাগবে, তাছাড়া অনেক কিছু শিখতে হবে, বুঝতে হবে, জানতে হবে। তেমনি তোমাদের বাবা-মা ও ১০ বছর পরের এই বর্তমানটাকে এদিনেই নিতে পারবেন না, উনাদের বুঝাতে হবে ধীরে ধীরে তুমি কি চাও, কেনো চাও। আলোচনা করতে হবে খোলাখুলি।

তুমি যখন ছোট ছিলে উনারাই কিন্তু তোমাকে লালন-পালন করে এই অব্দি এনেছেন। তোমার বন্ধু-বান্ধব কিন্তু তুমি যখন খেতে পারতে না, ছোটবেলায় হাটতে পারতে না এসে সাহায্য করে নি। যারা এত টা পথ তোমার সাথে ছিল, পাশাপাশি ছিল তারাই তো তোমাকে বুঝবে।

সব ছেলে-মেয়েদের মুখেই এক কথা, আব্বু-আম্মুর সাথে ফ্রি না, কেনো! তুমি যদি বাইরের কোন এক ফ্রেন্ড এর সাথে ফ্রি হতে পারো, তারা তো তোমার বাবা-মা, তোমার সব চাইতে কাছের মানুষ, আপন মানুষ এই পৃথিবীতে, আর তুমি তাদের সাথেই ফ্রি না! তাহলে কি বাবা-মা এর চাইতে বাইরের ফ্রেন্ড বেশি আপন তোমাদের কাছে!

তোমাদের কাছে হয়তো ভালোবাসা মানে চিৎকার করে “আমি তোমাকে ভালোবাসি” বলা, একগাদা প্রমিস করা তোমাকে খুশি রাখার, সব কথা শোনা, আবদার রাখা, ঘুরতে, খেতে নিয়ে যাওয়া।

কিন্তু ভালবাসা টা প্রকাশ করতে কোন মুখোচ্চারিত বর্ন লাগে না;
অনুভূতি, ভালোবাসা, স্নেহ, আদর এগুলোকে গুটিকয়েক বর্ণের খাঁচায় বন্দি করা যায় না। আর যে মানুষ দুটো তাঁদের একটা জীবন শুধু তাঁদের সন্তানের ভালো থাকার জন্য ই ব্যয় করছেন, আমার মনে হয় না এরপর আর কোন পথ কিংবা বর্ণ আছে তাঁদের এই ভালোবাসাটা প্রকাশ করার জন্য। অর্থাৎ প্রতিটি বাবা-মা ই তাঁদের সন্তানদের ভালোবাসেন ।

এরপরও কি বলবে বাবা-মা ভালো না , বুঝেন না, ভালোবাসে্ন না ?!!!

 

লেখিকাঃ শিক্ষার্থী ও সমাজকর্মী । 

 

***প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ইনিশিয়েটর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ইনিশিয়েটর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।