প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » বাস বৃত্তান্ত এবং একজন নারী

বাস বৃত্তান্ত এবং একজন নারী

প্রকাশ : ২১ ডিসেম্বর ২০১৭৪:২৩:২৩ অপরাহ্ন

খাতুনে জান্নাত 

আমাদের দেশে বাসে উঠতে গেলে একজন মেয়ে হিসেবে প্রথমেই যে কথাটা শুনতে হয় তা হলো, “আফা, মহিলা সিট নাই“। এর সোজা-সরল অর্থ হলো মহিলা সিট যেহেতু নেই, তুমি ফোটো! একটা বাসে মহিলা সিট থাকে কয়টা? সর্বোচ্চ ৯ টা। আর এমনি সিট ৩৫ থেকে ৪০ টার মতো। আর মানুষ ওঠে কতজন? সে হিসাব কি আর থাকে! যত চেপে ওঠানো যায়। অথচ এত এত মানুষের ভিড়েও আমাকে কোনো বাস নিতে চায় না! দোষটা কী আমার নাকি মহিলা সিটের বুঝতে পারি না।

যাক সে কথা। এবার আসি বাসের ভেতরকার চিত্রে। কোনোমতে একবার যদি বাসে উঠে যেতে পারি, তাহলেই আমি দেখি বাসে হেল্পার, ড্রাইভার সহ সবাই আমাকে মহিলা সিটে বসানোর জন্য জীবন দিয়ে চেষ্টা করছে! মহিলা সিট মানে বুঝেছেন তো? ওই যে ড্রাইভারের বাম পাশে গেটের পেছনে একটা সিট থাকে, যেখানে সবসময় তিনজনের জায়গায় পাঁচজন বসে, সেই পাঁচজনের জায়গায় “আরে আফা একটু চাইপা বসেন না!” বলে আরো একজন ঢোকানোর প্রাণপণ চেষ্টা করেন তারা সবাই মিলে। কী অমানবিক ব্যাপার! আবার যদি না বসতে চাই তাহলে বাস থেকে নামিয়ে দেয়ার হুমকিও দেয়। আশ্চর্য ঘটনা!

আরও একধরণের মানুষ থাকে বাসে, এরা কোনো মেয়ে দেখলে সিট ছেড়ে দেন। খুবই ভালো ব্যাপার, মানবিকতার খাতিরে তারা তা করতেই পারেন। কিন্তু আমি যদি বসতে না চাই, তাহলে আমাকে জোর করে বসানোটা কোন ধরণের সুস্থ মানবিকতা একটু বলতে পারেন কি কেউ? উনি আমাকে সিট ছেড়ে দিতে চেয়েছেন, কিন্তু আমার তার প্রয়োজন নেই। এতে আবার জোরাজুরির কী হলো? এমনভাবে কেউ কেউ জোরাজুরি করেন যে মনেহয় না বসতে চেয়ে কোনো অপরাধ করে ফেলেছি! বসতে দিলে চাইলে অসুস্থ কিংবা বৃদ্ধ কাউকে বসতে দিতে পারেন, কিন্তু একজন মেয়েকে বাসে দেখলেই যে তাকে নিজের সিট ছেড়ে দিয়ে বসতে দিতে হবে, এমন ধারণা আমাদের হলো কেন?

বাসে ওঠার পর একদম শুরুতেই নয়টা সিটের ওপর লেখা থাকে, “মহিলা, বৃদ্ধ, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত ৯ টি আসন” বৃদ্ধ, শিশু, প্রতিবন্ধী আর মহিলা এক হলো? মহিলাকে কেন প্রতিবন্ধী কিংবা শিশু কিংবা বৃদ্ধের ক্যাটাগরিতে ফেলা হলো? দেখতে ওরকম? নাকি আচরণ ওরকম? আমার মাথায় আসলে আসে না কোন যুক্তিতে ওখানে ওই কথাটা লেখা থাকে এবং কেন কেউ লেখাটা নিয়ে এখনো কোনো কথা বলে না।

সমস্যা আসলে আমাদের নিজেদেরই। একটা বাসে মহিলা সিট থাকে সর্বোচ্চ নয়টা, আরও বাকী কতগুলো সিট তো আছেই। সবগুলোই সিটই যদি ভরে যায় আর তারপরেও যদি একটি ছেলেকে বাসে উঠতে দেয়া হয়, তাহলে একটি মেয়েকে দিতে কী সমস্যা? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আসলে এমন হওয়া খুব কঠিন যে সব মানুষই বসে যাতায়াত করতে পারবে। এটা আমরা জানি। তাহলে অসুবিধাটা কোথায়? সবকিছু জানি, সবই বুঝি, তবু সিট না থাকলে একজন মেয়েকে বাসে উঠতে দেব না – এই হলো আমাদের মনোভাব। তাহলে মেয়েটা কীভাবে যাবে? হেঁটে হেঁটে? হামাগুড়ি দিয়ে?

এমন অনেকবার হয়েছে যে আমি ফার্মগেট থেকে কিংবা শাহবাগ থেকে মিরপুর হেঁটে এসেছি। পুরোপুরি হেঁটে। এর কারণ কোনো বাসের হেল্পার আমাকে বাসে তোলেন নি। তারা গন্ডায় গন্ডায় ছেলে তুলতে পেরেছে কিন্তু আমাকে তারা কিছুতেই তুলবে না।

আমাকে তুললেও যে হেল্পারকে কেউ ছেড়ে দিতো তাও বলা যায় না। বাসে অনেক ভদ্রলোক থাকেন, মেয়েদেরকে দাঁড়িয়ে যেতে দেখলেই তাদের মাথায় রক্ত উঠে যায়। আমার এক পরিচিত আপু একটা ঘটনা বলেছিলেন। তিনি একবার বাসে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিলেন, তখন বসে থাকা একজন লোক হেল্পারকে তুমুল বকাবকি শুরু করেন বাসে মহিলা তোলার জন্য। আপু যখন তার কথার জবাব দিয়ে বললেন, “মেয়েদেরকে বাসে না তুললে মেয়েরা বাসায় যাবে কীভাবে?” তখন তিনি রেগেমেগে বললেন, “দুই মহিলা মিল্লা দেশটারে ভাইজা খাইতেসে, এখন এরাও খাবে! মেয়ে মানুষ হয়ে রাস্তাঘাটে বের হওয়ার দরকার কী?”

এই হলো অবস্থা। আমাদের মাথায় আজও আসে মেয়ে মানুষ হয়ে রাস্তায় বের হওয়ার দরকার কী। মাঝেমাঝে আমার কাছে কেন যেন মনেহয় পুরুষেরা বোধহয় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। বহু বহু দিন তারা মেয়েকে ঘরে আটকে রেখেছে বিভিন্ন দোহাই দিয়ে, এখন আর পারছে না। মেয়েরা সমস্তক্ষেত্রে পিছিয়ে শুধুমাত্র হাজার বছর ধরে বন্দী থাকার জন্যেই। আজ যখন মেয়েরা সেই বন্দীত্ব কাটিয়ে মুক্ত হচ্ছে, তখন তাদের বোধহয় নিরাপত্তাহীনতা বোধ হচ্ছে। হাজার বছরের শাসন, নারীর ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করে তাকে শিকলে বেঁধে রাখার পালা যে এবার শেষ হতে চললো! এ কারণেই তাদের এত ভয়।

সবার শুধু প্রশ্ন মেয়ে মানুষ হয়ে বাইরে বের হওয়ার দরকার কী। আচ্ছা, ধরে নিলাম কোনো দরকার নেই। আমি পাড়া বেড়াতে বের হয়েছি। আপনার কী হে ভাই? আপনি ঘুরতে বের হন না? যদিও আমাদের দেশে বেশিরভাগ মেয়ে জরুরী কাজ ছাড়া বাইরে বের হয় না, তবুও যদি ঘুরতেও বের হয়, এটা কি তার দোষ হবে? একজন পুরুষের কাছে কেউ তার জবাবদিহি না চাইলে একজন মেয়ের কাছে চাওয়ার যুক্তি কী?

বাসে ওঠার ধাক্কাধাক্কি-ভিড়ে একটা মেয়েও ঢুকে পড়লে তো কেল্লাফতে! এবার তো মেয়েটার গায়ে হাত দেয়া ফরজ! এবং এই ভয়ে মা-বাবা মেয়েদেরকে ঘর থেকে বের হতে দিতে চান না। ব্যাপারটা আমার বোধগম্য নয়। রাস্তায় একটা পাগল কুকুর ঘুরছে যে মানুষ পেলেই কামড়ায়। এখন সেই কুকুরের ভয়ে যদি আমরা সবাই সব কাজ ফেলে ঘরে বসে থাকি তাহলে কি কোনো লাভ হবে? নাকি কুকুরটাকে আটকে রাখতে হবে? এক্ষেত্রে তবে কুকুর না আটকে মেয়েকে কেন বন্দী করে রাখা হচ্ছে? মস্তিষ্ক যাদের বিকৃত, তাদের জানালার সাথে শিকল পরিয়ে বসিয়ে না রেখে মেয়েদেরকেই উল্টো তা করা হচ্ছে! আশ্চর্য!

আমাদের মেয়েদেরও অবশ্য সমস্যা আছে। কেউ গায়ে হাত দিলে চুপ করে থাকি। কেন চুপ করে থাকি? কারণ আমাদের ধারণা কেউ আমার গায়ে হাত দিয়েছে এটা খুব লজ্জার কথা। নিজের শরীর নিয়ে এত সংকোচ কোথায় শিখলাম আমরা? যে নিজের হাতকে সামলে রাখতে পারে না, লজ্জা হবে তার, আমার না। যদি আমরা প্রতিবাদ করতে শিখতাম তাহলে আজ আর কেউ এরকম করার সাহসও পেত না, আর নিজের নিরাপত্তার জন্য কোনো মহিলা সিটেরও প্রয়োজন হতো না।

ব্যক্তিগতভাবে আমি আসলে মনে করি মহিলা সিটের কোনো প্রয়োজন নেই। হ্যাঁ, শিশু, বয়স্ক কিংবা অসুস্থ হলে তার জন্য বসার জায়গার অবশ্যই দরকার আছে, কিন্তু একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের জন্য ‘কোটা’ প্রথায় আমি বিশ্বাসী না। এই মহিলা সিটের জন্যই আসলে বাসে এত ঝামেলা। মহিলা সিট না থাকলে ‘মহিলা সিট নাই আফা’ বলতে পারতো না!

আমরা মেয়েরাও অদ্ভুত। সব দিক থেকে ‘মেয়ে’ হওয়ার সুবিধা পেতে চাইছি। কেন? একটা আপুর কথা শুনলাম। তার এক বন্ধু বাসে উঠে তার পাশের জানালার পুরোটা খুলে ফেলল, যে পেছনে আছে তারটা পুরো বন্ধ হয়ে গেল সেদিকে তার খেয়ালই নেই! আপু যেই বলল, “পেছনের মানুষের জানালা বন্ধ করে রেখে এভাবে বসা ঠিক না”, তখন তার বান্ধবী বললো, “আজব! আমি মেয়ে না?”

অদ্ভুত না ব্যাপারটা? মেয়ে হলে আমার বাতাসের দরকার আছে, ছেলে হলে নেই? আমি মনে করি সমস্ত সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ এবার একইরকম ভাবে চলুক, একই সুবিধা পেয়ে চলুক। আমি চাই না মেয়ে হওয়ার কারণে কেউ যেচে এসে আমাকে আলাদা সুবিধা দিক। যদি ছেলেদেরকেও তা দেয় তাহলে আমি নিতে রাজি আছি, তা না হলে নয়। অনেক হয়েছে, এবার ‘নারী কোটা’-টা বন্ধ হলে কেমন হয়?

শেষ করি আমার ছেলে বন্ধুদের গল্প দিয়ে। আমি যখন আমার ছেলেবন্ধুদের নিয়ে বাসে উঠি তখন বাসে সিট না থাকলেও বাসের সমস্ত মানুষ উঠেপড়ে লাগে আমাকে বসতে দেয়ার জন্য। অথচ আমার সমবয়সী একটা ছেলেও যে এখানে দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে কারও হুঁশই নেই! সবার ধারণা ও তো দাঁড়িয়ে যেতেই পারবে, পারব না কেবল আমি! আমি কখনোই মহিলা সিটে বসতে চাই না, কিন্তু বাসের হেল্পার যখন আমাকে জোর-জবরদস্তি করে মহিলা সিটে বসাতে চায়, এবং বাসের সবাই তার সাথে যোগ দেয়, আমি অবাক হয়ে দেখি আমার ছেলেবন্ধুগুলো একটি কথাও বলছে না! একবারের জন্যেও আমাকে সাপোর্ট করে বলছে না, ‘ও যখন বসতে চাইছে না আপনাদের সমস্যা কী?’ আমরা উঠেছি একসাথে, মেয়ে হওয়ার সুবাদে (এটাকে সুবাদে বলা যায় নাকি তা অবশ্য জানি না!) আমাকে বসানোর জন্য সবাই টানাটানি করে, কই, ওদেরকে তো কেউ করে না!

কোনো সিট খালি হলেও দেখি আমার বন্ধুরা আমাকে ডেকে বসতে বলে। কেন? ওর পাশে সিট খালি হয়েছে, ও বসবে। আমার পাশে সিট খালি হলে আমি বসব। কিন্তু ওই যে ওদের মধ্যে ধারণা, “ও মেয়ে”!

একটা মেয়ে হয়েই জন্মেছি ভাই, এলিয়েন না। আমরাও মানুষ, দুইটা করে হাত-পা আছে। এখন অন্তত আমরা একটু ভাবতে শিখি যে মেয়েরা সেই হাত-পায়ের ব্যবহার করতে জানে। তারা অন্যের ঘাড়ের ওপর ভর করে চলে না। এরপর থেকে একটা মেয়েকে ‘মহিলা’ ভেবে আলাদা না করে দিয়ে তাকে আপনারই মতো একজন ‘মানুষ’ ভাববেন। দেখবেন, তখন আর দূর্বল মনে হবে না। নিজের মতোই মনে হবে।আমাদের দেশে বাসে উঠতে গেলে একজন মেয়ে হিসেবে প্রথমেই যে কথাটা শুনতে হয় তা হলো, “আফা, মহিলা সিট নাই”। এর সোজা-সরল অর্থ হলো মহিলা সিট যেহেতু নেই, তুমি ফোটো! একটা বাসে মহিলা সিট থাকে কয়টা? সর্বোচ্চ ৯ টা। আর এমনি সিট ৩৫ থেকে ৪০ টার মতো। আর মানুষ ওঠে কতজন? সে হিসাব কি আর থাকে! যত চেপে ওঠানো যায়। অথচ এত এত মানুষের ভিড়েও আমাকে কোনো বাস নিতে চায় না! দোষটা কী আমার নাকি মহিলা সিটের বুঝতে পারি না।

যাক সে কথা। এবার আসি বাসের ভেতরকার চিত্রে। কোনোমতে একবার যদি বাসে উঠে যেতে পারি, তাহলেই আমি দেখি বাসে হেল্পার, ড্রাইভার সহ সবাই আমাকে মহিলা সিটে বসানোর জন্য জীবন দিয়ে চেষ্টা করছে! মহিলা সিট মানে বুঝেছেন তো? ওই যে ড্রাইভারের বাম পাশে গেটের পেছনে একটা সিট থাকে, যেখানে সবসময় তিনজনের জায়গায় পাঁচজন বসে, সেই পাঁচজনের জায়গায় “আরে আফা একটু চাইপা বসেন না!” বলে আরো একজন ঢোকানোর প্রাণপণ চেষ্টা করেন তারা সবাই মিলে। কী অমানবিক ব্যাপার! আবার যদি না বসতে চাই তাহলে বাস থেকে নামিয়ে দেয়ার হুমকিও দেয়। আশ্চর্য ঘটনা!

আরও একধরণের মানুষ থাকে বাসে, এরা কোনো মেয়ে দেখলে সিট ছেড়ে দেন। খুবই ভালো ব্যাপার, মানবিকতার খাতিরে তারা তা করতেই পারেন। কিন্তু আমি যদি বসতে না চাই, তাহলে আমাকে জোর করে বসানোটা কোন ধরণের সুস্থ মানবিকতা একটু বলতে পারেন কি কেউ? উনি আমাকে সিট ছেড়ে দিতে চেয়েছেন, কিন্তু আমার তার প্রয়োজন নেই। এতে আবার জোরাজুরির কী হলো? এমনভাবে কেউ কেউ জোরাজুরি করেন যে মনেহয় না বসতে চেয়ে কোনো অপরাধ করে ফেলেছি! বসতে দিলে চাইলে অসুস্থ কিংবা বৃদ্ধ কাউকে বসতে দিতে পারেন, কিন্তু একজন মেয়েকে বাসে দেখলেই যে তাকে নিজের সিট ছেড়ে দিয়ে বসতে দিতে হবে, এমন ধারণা আমাদের হলো কেন?

বাসে ওঠার পর একদম শুরুতেই নয়টা সিটের ওপর লেখা থাকে, “মহিলা, বৃদ্ধ, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত ৯ টি আসন” বৃদ্ধ, শিশু, প্রতিবন্ধী আর মহিলা এক হলো? মহিলাকে কেন প্রতিবন্ধী কিংবা শিশু কিংবা বৃদ্ধের ক্যাটাগরিতে ফেলা হলো? দেখতে ওরকম? নাকি আচরণ ওরকম? আমার মাথায় আসলে আসে না কোন যুক্তিতে ওখানে ওই কথাটা লেখা থাকে এবং কেন কেউ লেখাটা নিয়ে এখনো কোনো কথা বলে না।

সমস্যা আসলে আমাদের নিজেদেরই। একটা বাসে মহিলা সিট থাকে সর্বোচ্চ নয়টা, আরও বাকী কতগুলো সিট তো আছেই। সবগুলোই সিটই যদি ভরে যায় আর তারপরেও যদি একটি ছেলেকে বাসে উঠতে দেয়া হয়, তাহলে একটি মেয়েকে দিতে কী সমস্যা? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আসলে এমন হওয়া খুব কঠিন যে সব মানুষই বসে যাতায়াত করতে পারবে। এটা আমরা জানি। তাহলে অসুবিধাটা কোথায়? সবকিছু জানি, সবই বুঝি, তবু সিট না থাকলে একজন মেয়েকে বাসে উঠতে দেব না – এই হলো আমাদের মনোভাব। তাহলে মেয়েটা কীভাবে যাবে? হেঁটে হেঁটে? হামাগুড়ি দিয়ে?

এমন অনেকবার হয়েছে যে আমি ফার্মগেট থেকে কিংবা শাহবাগ থেকে মিরপুর হেঁটে এসেছি। পুরোপুরি হেঁটে। এর কারণ কোনো বাসের হেল্পার আমাকে বাসে তোলেন নি। তারা গন্ডায় গন্ডায় ছেলে তুলতে পেরেছে কিন্তু আমাকে তারা কিছুতেই তুলবে না।

আমাকে তুললেও যে হেল্পারকে কেউ ছেড়ে দিতো তাও বলা যায় না। বাসে অনেক ভদ্রলোক থাকেন, মেয়েদেরকে দাঁড়িয়ে যেতে দেখলেই তাদের মাথায় রক্ত উঠে যায়। আমার এক পরিচিত আপু একটা ঘটনা বলেছিলেন। তিনি একবার বাসে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিলেন, তখন বসে থাকা একজন লোক হেল্পারকে তুমুল বকাবকি শুরু করেন বাসে মহিলা তোলার জন্য। আপু যখন তার কথার জবাব দিয়ে বললেন, “মেয়েদেরকে বাসে না তুললে মেয়েরা বাসায় যাবে কীভাবে?” তখন তিনি রেগেমেগে বললেন, “দুই মহিলা মিল্লা দেশটারে ভাইজা খাইতেসে, এখন এরাও খাবে! মেয়ে মানুষ হয়ে রাস্তাঘাটে বের হওয়ার দরকার কী?”

এই হলো অবস্থা। আমাদের মাথায় আজও আসে মেয়ে মানুষ হয়ে রাস্তায় বের হওয়ার দরকার কী। মাঝেমাঝে আমার কাছে কেন যেন মনেহয় পুরুষেরা বোধহয় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। বহু বহু দিন তারা মেয়েকে ঘরে আটকে রেখেছে বিভিন্ন দোহাই দিয়ে, এখন আর পারছে না। মেয়েরা সমস্তক্ষেত্রে পিছিয়ে শুধুমাত্র হাজার বছর ধরে বন্দী থাকার জন্যেই। আজ যখন মেয়েরা সেই বন্দীত্ব কাটিয়ে মুক্ত হচ্ছে, তখন তাদের বোধহয় নিরাপত্তাহীনতা বোধ হচ্ছে। হাজার বছরের শাসন, নারীর ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করে তাকে শিকলে বেঁধে রাখার পালা যে এবার শেষ হতে চললো! এ কারণেই তাদের এত ভয়।

সবার শুধু প্রশ্ন মেয়ে মানুষ হয়ে বাইরে বের হওয়ার দরকার কী। আচ্ছা, ধরে নিলাম কোনো দরকার নেই। আমি পাড়া বেড়াতে বের হয়েছি। আপনার কী হে ভাই? আপনি ঘুরতে বের হন না? যদিও আমাদের দেশে বেশিরভাগ মেয়ে জরুরী কাজ ছাড়া বাইরে বের হয় না, তবুও যদি ঘুরতেও বের হয়, এটা কি তার দোষ হবে? একজন পুরুষের কাছে কেউ তার জবাবদিহি না চাইলে একজন মেয়ের কাছে চাওয়ার যুক্তি কী?

বাসে ওঠার ধাক্কাধাক্কি-ভিড়ে একটা মেয়েও ঢুকে পড়লে তো কেল্লাফতে! এবার তো মেয়েটার গায়ে হাত দেয়া ফরজ! এবং এই ভয়ে মা-বাবা মেয়েদেরকে ঘর থেকে বের হতে দিতে চান না। ব্যাপারটা আমার বোধগম্য নয়। রাস্তায় একটা পাগল কুকুর ঘুরছে যে মানুষ পেলেই কামড়ায়। এখন সেই কুকুরের ভয়ে যদি আমরা সবাই সব কাজ ফেলে ঘরে বসে থাকি তাহলে কি কোনো লাভ হবে? নাকি কুকুরটাকে আটকে রাখতে হবে? এক্ষেত্রে তবে কুকুর না আটকে মেয়েকে কেন বন্দী করে রাখা হচ্ছে? মস্তিষ্ক যাদের বিকৃত, তাদের জানালার সাথে শিকল পরিয়ে বসিয়ে না রেখে মেয়েদেরকেই উল্টো তা করা হচ্ছে! আশ্চর্য!

আমাদের মেয়েদেরও অবশ্য সমস্যা আছে। কেউ গায়ে হাত দিলে চুপ করে থাকি। কেন চুপ করে থাকি? কারণ আমাদের ধারণা কেউ আমার গায়ে হাত দিয়েছে এটা খুব লজ্জার কথা। নিজের শরীর নিয়ে এত সংকোচ কোথায় শিখলাম আমরা? যে নিজের হাতকে সামলে রাখতে পারে না, লজ্জা হবে তার, আমার না। যদি আমরা প্রতিবাদ করতে শিখতাম তাহলে আজ আর কেউ এরকম করার সাহসও পেত না, আর নিজের নিরাপত্তার জন্য কোনো মহিলা সিটেরও প্রয়োজন হতো না।

ব্যক্তিগতভাবে আমি আসলে মনে করি মহিলা সিটের কোনো প্রয়োজন নেই। হ্যাঁ, শিশু, বয়স্ক কিংবা অসুস্থ হলে তার জন্য বসার জায়গার অবশ্যই দরকার আছে, কিন্তু একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের জন্য ‘কোটা’ প্রথায় আমি বিশ্বাসী না। এই মহিলা সিটের জন্যই আসলে বাসে এত ঝামেলা। মহিলা সিট না থাকলে ‘মহিলা সিট নাই আফা’ বলতে পারতো না!

আমরা মেয়েরাও অদ্ভুত। সব দিক থেকে ‘মেয়ে’ হওয়ার সুবিধা পেতে চাইছি। কেন? একটা আপুর কথা শুনলাম। তার এক বন্ধু বাসে উঠে তার পাশের জানালার পুরোটা খুলে ফেলল, যে পেছনে আছে তারটা পুরো বন্ধ হয়ে গেল সেদিকে তার খেয়ালই নেই! আপু যেই বলল, “পেছনের মানুষের জানালা বন্ধ করে রেখে এভাবে বসা ঠিক না”, তখন তার বান্ধবী বললো, “আজব! আমি মেয়ে না?”

অদ্ভুত না ব্যাপারটা? মেয়ে হলে আমার বাতাসের দরকার আছে, ছেলে হলে নেই? আমি মনে করি সমস্ত সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ এবার একইরকম ভাবে চলুক, একই সুবিধা পেয়ে চলুক। আমি চাই না মেয়ে হওয়ার কারণে কেউ যেচে এসে আমাকে আলাদা সুবিধা দিক। যদি ছেলেদেরকেও তা দেয় তাহলে আমি নিতে রাজি আছি, তা না হলে নয়। অনেক হয়েছে, এবার ‘নারী কোটা’-টা বন্ধ হলে কেমন হয়?

শেষ করি আমার ছেলে বন্ধুদের গল্প দিয়ে। আমি যখন আমার ছেলেবন্ধুদের নিয়ে বাসে উঠি তখন বাসে সিট না থাকলেও বাসের সমস্ত মানুষ উঠেপড়ে লাগে আমাকে বসতে দেয়ার জন্য। অথচ আমার সমবয়সী একটা ছেলেও যে এখানে দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে কারও হুঁশই নেই! সবার ধারণা ও তো দাঁড়িয়ে যেতেই পারবে, পারব না কেবল আমি! আমি কখনোই মহিলা সিটে বসতে চাই না, কিন্তু বাসের হেল্পার যখন আমাকে জোর-জবরদস্তি করে মহিলা সিটে বসাতে চায়, এবং বাসের সবাই তার সাথে যোগ দেয়, আমি অবাক হয়ে দেখি আমার ছেলেবন্ধুগুলো একটি কথাও বলছে না! একবারের জন্যেও আমাকে সাপোর্ট করে বলছে না, ‘ও যখন বসতে চাইছে না আপনাদের সমস্যা কী?’ আমরা উঠেছি একসাথে, মেয়ে হওয়ার সুবাদে (এটাকে সুবাদে বলা যায় নাকি তা অবশ্য জানি না!) আমাকে বসানোর জন্য সবাই টানাটানি করে, কই, ওদেরকে তো কেউ করে না!

কোনো সিট খালি হলেও দেখি আমার বন্ধুরা আমাকে ডেকে বসতে বলে। কেন? ওর পাশে সিট খালি হয়েছে, ও বসবে। আমার পাশে সিট খালি হলে আমি বসব। কিন্তু ওই যে ওদের মধ্যে ধারণা, “ও মেয়ে”!

একটা মেয়ে হয়েই জন্মেছি ভাই, এলিয়েন না। আমরাও মানুষ, দুইটা করে হাত-পা আছে। এখন অন্তত আমরা একটু ভাবতে শিখি যে মেয়েরা সেই হাত-পায়ের ব্যবহার করতে জানে। তারা অন্যের ঘাড়ের ওপর ভর করে চলে না। এরপর থেকে একটা মেয়েকে ‘মহিলা’ ভেবে আলাদা না করে দিয়ে তাকে আপনারই মতো একজন ‘মানুষ’ ভাববেন। দেখবেন, তখন আর দূর্বল মনে হবে না। নিজের মতোই মনে হবে।

লেখকঃ শিক্ষার্থী (৯ম শ্রেণি), শহীদ পুলিশ স্মৃতি স্কুল এন্ড কলেজ 
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।