প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » পিরিয়ড সমাচার

পিরিয়ড সমাচার

প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর ২০১৭৯:০৮:৩১ অপরাহ্ন

কাজী মোয়াজ্জমা তাসনিম

রোমেল আর তমাল দুই বন্ধু। কলেজ ছুটির পর চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেওয়া তাদের নিত্যদিনের কাজ। আজকেও তার ব্যতিক্রম হয় নি। আড্ডার এক পর্যায়ে তমাল বলল, দোস্ত আজকে উঠি রে। শরীরটা ভালো নেই। রোমেলের মুখে ফুঁটে উঠল নোংরা হাসির রেখা। হাসিটা ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে রেখেই বলল, কেন কী হয়েছে? পিরিয়ড নাকি? রোমেলের বলার ভঙ্গীতে তমাল হেসে উঠলো। তাদের সাথে হেসে উঠলো দোকানে আসা আরো অনেকেই। রোমেলের হয়ত মনে নেই তার ছোট বোনটা আজ স্কুলে যেতে পারে নি। বাসা থেকে বের হওয়ার সময়ও দেখে এসেছে বোনটা তার পিরিয়ডের প্রচন্ড ব্যথায় বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছে।

উপরের দৃশ্যকল্পটি কাল্পনিক। চরিত্রগুলোও। কিন্তু বাস্তবেও এই মানুষগুলোর সংখ্যা কিন্তু নেহায়েত কম নয়। এই ঘটনাগুলোই ঘটে চলছে প্রতিদিন। আমাদের আশেপাশেই।

মেন্সট্রুয়াল সাইকেল বা পিরিয়ড। এটা একটা নিষিদ্ধ শব্দ। এই শব্দটা যত কম উচ্চারণ করা যায় ততই ভালো। প্রকাশ্যে “শরীর খারাপ, অসুখ, পেটব্যথা” এই জাতীয় শব্দগুলো ব্যবহার করতে হয়। পিরিয়ড শব্দটা উচ্চারণ করতে হয় গোপনে। এটা নিয়ে কথা বলা পাপ পাঠ্যপুস্তকে ব্যাপারটা যুক্ত করার পর সুশীল পাড়ায় ছি ছি পড়ে যায়। এসব পড়লে নাকি কিশোর সমাজের মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটে। কিন্তু হাসি ঠাট্টা কিংবা নোংরা ইঙ্গিত হলে ঠিক আছে। জাস্ট ফান হিসেবে তো কতকিছুই বলা যায় আজকাল!

মানুষের শরীরে প্রতিনিয়ত চলছে নানা রকমের শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া। ফুসফুস অক্সিজেন নিয়ে কার্বন ডাই অক্সাইড বের করে দিচ্ছে। হৃদপিন্ড রক্ত পাম্প করে চলছে। নির্দিষ্ট সময় পর পর আমাদের রক্তকণিকাগুলো ভেঙে যায়, একই সময়ে নতুন কণিকা জন্ম নেয়। শরীরের জীবিত কোষগুলো একসময় মরে যায়, নতুন কোষ জন্মায়। খাবার খাওয়ার পর পরিপাকতন্ত্র খাবার থেকে প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো আলাদা করে বাড়তি জিনিসগুলো শরীর থেকে বের করে দিচ্ছে। এমনই একটা স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া হচ্ছে এই পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব।

এটা নারীদের প্রজনন প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কযুক্ত। প্রতিটি সুস্থ ও সক্ষম নারীর ডিম্বাশয় প্রতি ২৮ দিন পরপর ডিম্বাণু নিঃসরণ করে। ডিম্বাণু যদি নিষিক্ত না হয় তাহলে সেই অনিষিক্ত ডিম্বাণু ভেঙ্গে যাওয়া রক্তকণিকা, শ্বেত কনিকা, জরায়ুমুখের মিউকাস, জরায়ু আবরণ, ব্যাকটেরিয়া, প্লাজমিন, প্রস্টাগ্লানডিন প্রভৃতির সাথে জননেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে বের হয়ে যায়। একটি মেয়ের পিরিয়ড হচ্ছে মানে তার শরীর ভবিষ্যত প্রজন্মকে পৃথিবীর আলো দেখাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। আপনার বোন প্রতি মাসে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। আপনার স্ত্রী প্রতি মাসে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায় বলেই আপনি বাবা ডাকটা শুনতে পাবেন। আপনার মা এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছে বলেই আপনি আজ এই লেখাটি পড়তে পারছেন।

তবুও পিরিয়ড একটা অশ্লিল ব্যাপার। গোপন ব্যাপার। নোংরা ও অপবিত্র। একটা মেয়ের যখন পিরিয়ড হয় তখন তার আশেপাশে তুলে দেওয়া হয় অসংখ্য অসংখ্য দেয়াল। তুমি বড় হয়ে গিয়েছো সুতরাং এখন আর ছেলেদের সাথে মিশতে পারবে না, বাইরে গিয়ে খেলতে পারবে না, ফ্রক পরতে পারবে না, আগের মত হাসতে পারবে না, ঘুরতে পারবে না….. একটু নিম্নবিত্ত সমাজে তো বিয়েই দিয়ে দেওয়া হয়। কত যে বাধা নিষেধ আর কুসংস্কারের বেড়াজাল! তুমি মাত্র ১৩ বছরের কিশোরী কিন্তু তোমার উপরে জোর করেই চাপিয়ে দেওয়া হবে নারীত্ব। তোমাকে জোর করে বড় করে ফেলা হবে। তোমার জগতটাকে কেটেছেঁটে ছোট করে ফেলা হবে। আরো কত কী!

যে কোন অশ্লিল ব্যাপারের মত এটাকেও গোপন রাখতে হয়। ফার্মেসিতে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে গেলে একটু অপেক্ষা করতে হয়। ভিড় কমে গেলে দোকানদারকে কানে কানে বলতে হয়। দোকানদার সবার চোখ এড়িয়ে প্যাকেটটা দ্রুত একটা ব্রাউন পেপারে মুড়ে হাতে দেবে। তারপর সেই ব্রাউন পেপারটা

কোথাও লুকিয়ে চুপিচুপি ফিরে আসতে হবে। যেন স্যানিটারি ন্যাপকিন নয়, বোমা কেনা হচ্ছে। তবুও ঘটনাটা কখনো কখনো পাড়ার বখাটে ছেলেদের নজরে পড়ে যায়। তাদের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ভেসে আসে কুৎসিত আওয়াজ আর নোংরা ইঙ্গিত। ওসব শুনে মাথা নিচু করে চলে আসতে হয়। লজ্জা পেতে হয়। যেন লজ্জাটা নারীত্বের। কিংবা হয়ত লজ্জাটা আসলে তাদের মত কিছু আবর্জনা জন্ম দেওয়ারই!

অন্য অনেক কিছুর মত পিরিয়ডও একটা ট্যাবু হওয়ায় এটা সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখে এমন মানুষ আসলে কমই আছে। সচেতনতার অভাবে তাই মেয়েরা সহজেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। পিরিয়ড সম্পর্কিত জটিলতা থাকা সত্ত্বেও লজ্জায় মুখ ফুঁটে বলতে পারে না অনেকেই। জটিলতা যখন বিশাল আকার ধারণ করে তখনই ঘটে বিপত্তি। অজ্ঞতাটা ছেলে- মেয়ে দুইজনের হলেও ভুক্তভোগী কিন্তু মেয়েরাই।

অথচ ব্যাপারটা অন্যরকম হলেও হতে পারত। সহজ বিষয়টাকে সহজভাবে নিতে পারলেই সমাধান হয়ে যেত সবগুলো সমস্যার। খামোখাই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার নিয়ে নোংরামির চূড়ান্ত করে দিনশেষে নিজেদের ক্ষতি করছি, ক্ষতি করছি নিজেদের ভবিষ্যত প্রজন্মেরও। আমরা কবে মানুষ হব?

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।