প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » গণপরিবহনে যাতায়াত- করণীয় এবং বর্জনীয়

গণপরিবহনে যাতায়াত- করণীয় এবং বর্জনীয়

প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারী ২০১৮১০:১০:১৯ অপরাহ্ন

কাজী মোয়াজ্জমা তাসনিম

আমরা মধ্য আয়ের দেশ। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের সামর্থ্য আমাদের নেই। তাই দৈনন্দিন জীবনের একটা অপরিহার্য উপাদান হচ্ছে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট। কিন্তু চিন্তা চেতনায় মধ্যযুগে পড়ে থাকা একটি জাতির হাতে আধুনিক প্রযুক্তি তুলে দিলে যা হয়- আমরা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট পেয়েছি ঠিকই, সেটাতে কিভাবে যাতায়াত করতে হয় তা শিখে উঠতে পারি নি।

নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষ প্রতিদিন ঘর থেকে বের হয় জীবনের আহ্বানে, জীবিকার প্রয়োজনে। ব্যক্তিগত ট্রান্সপোর্ট ব্যবহারের সাধ্য আছে কয়জনের? তাই পাবলিক ট্রান্সপোর্টই ভরসা। কিন্তু এই একমাত্র ভরসাটাও নিরাপদ নয় নারীদের জন্য। পাবলিক ট্রান্সপোর্টে হয়রানি এই শহরে নিত্যদিনকার ঘটনা। অথচ নির্দিষ্ট আচরণবিধি

মেনে চললেই কিন্তু এই হয়রানি প্রতিরোধ করা সম্ভব। কী সেই আচরণবিধি? চলুন দেখে নেওয়া যাক!

১.
বাসে উঠলেন। পুরো বাসটাই হয়ত প্রায় ফাঁকা। এরমধ্যে দেখলেন একটা মেয়ে একা একটা সিটে বসে
আছে। আপনি ওমনি “লটারি পাইছি মাম্মাহ!” বলে গিয়ে তার পাশে বসে পড়বেন না। বলতে পারেন ভাড়া যেহেতু দিবেন, সিটে বসতে সমস্যা কী? সিট তো কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি না। আসলে আপাতদৃষ্টিতে কোন সমস্যা নাই। কিন্তু ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু। একই সাথে অশোভনও। অন্য কোন ফাঁকা সিট দেখে বসুন।

২.
পাশের সহযাত্রী মেয়ে হোক আর ছেলে, দুইজন অপরিচিত মানুষ পাশাপাশি বসতে হলে দুজনের মাঝে ন্যূনতম একটা জায়গা ফাঁকা রেখে বসতে হয়। এটাকে আমরা বলতে পারি “দ্য গ্যাপ অব মডেস্টি”। গ্যাপ অব মডেস্টি বজায় রাখুন সবসময়। পাশের যাত্রীটা আপনার ইয়ার দোস্ত না যে আপনি তার কোলের উপর উঠে বসবেন।

৩.
গাড়িতে আপনার ঘুম পাচ্ছে? বেশ ভালো কথা। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে যদি আপনার মাথাব্যথা না থাকে তাহলে নির্দ্বিধায় ঘুমাতে পারেন। কিন্তু শরীরটা সামলে। হেলতে হেলতে পাশের জনের উপর হেলে পড়বেন না। এটা আপনার বেডরুম না। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট।

৪.
বাসে পাশাপাশি দুটো সিট রাখা হয় দুইজনের বসার জন্য। একজনের হাফ সিট আরেকজনের দেড় সিট- ভাগাভাগি টা এরকম হয় না ভাই। আরেকজনের সিটের উপর দখলদারি করতে যাবেন না। নিজের যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকুন। আপনার যদি জায়গা বেশি লাগে একা দুই সিট নিয়ে যান।

৫.
বাসের সবচেয়ে আলোচিত এবং সবচেয়ে বেশি মুখোমুখি হওয়া ব্যাপারটা হচ্ছে পুরুষ যাত্রীদের পা ছড়িয়ে বসা। দুই পা দুইদিকে ছড়িয়ে বসা খাস বাংলায় যেটাকে “চ্যাগানো” বলে। বাসে ভালোভাবে বসে যান। চ্যাগাবেন না। যদি চ্যাগাতেই হয় নিজের জায়গায় বসে সামনে পিছে, ভেতরে, বাইরে যেদিকে খুশি চ্যাগান। কিন্তু চ্যাগাতে চ্যাগাতে পাশের যাত্রীকে কোনঠাসা করে ফেলবেন না।

৬.
পাশে মহিলা যাত্রী। পকেটে ফোন/ টাকা। বের করা ফরজ হয়ে গেছে? দাঁড়িয়ে কিংবা ওদিক চেপে পকেট থেকে যা বের করার বের করুন। আবার ঢোকানোর সময়ও একই পদ্ধতি। পকেট ব্যবহারের ছলে পাশের মহিলা যাত্রীকে কনুই দিয়ে গুঁতানোর অভ্যাসটা পরিহার করুন।

৭.
বাসে দাঁড়িয়ে আছেন। পাশে মহিলা যাত্রী দাঁড়ানো বা বসা। দুইজনের মধ্যে ন্যূনতম একটা দূরত্ব বজায় রাখুন। হাত অথবা কোমরে যদি বড়সড় কোন সমস্যা না থাকে তাহলে সোজা হয়ে দাঁড়ান। আর সমস্যা থাকলে প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত সিট ব্যবহার করুন। হাত, পা কিংবা পুরুষাঙ্গের অনেক প্রয়োজনীয় ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু বাসের মহিলা যাত্রীকে উত্যক্ত করা তার মধ্যে একটা নয়।

৮.
মহিলা শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত সিট ফাঁকা থাকলে আপনি সেখানে বসতেই পারেন। কিন্তু এদের কেউ যদি বাসে উঠে দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে তাদের সিট তাদের জন্য ছেড়ে দিন। একজন মহিলা ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে হয়রানির শিকার হবে এবং আপনি তার জন্য সংরক্ষিত আসনে বসে বসে আরাম করবেন, নিয়মের কথা বাদই দিলাম। আপনার বিবেক কিভাবে সায় দেয়?

৯.
কারো সাথে কথা বলতে খুব ইচ্ছা হচ্ছে? নিজের পরিচিত কাউকে ফোন দিয়ে কথা বলুন না। পাশের অপরিচিত মহিলা যাত্রীকে “কোথায় যাবেন, কী করেন, কই থাকেন” টাইপের প্রশ্ন করে খেজুরে আলাপ জমাতে যাবেন না।

১০.
আপনি হয়ত কাউকে উত্যক্ত করছেন না। কিন্তু অন্য কাউকে করতে দেখছেন। নিজের জায়গা থেকে প্রতিবাদ করুন। পুরুষত্ব হোক বা মনুষত্ব, সেটা জাহির করার এরচেয়ে ভালো সুযোগ আর কখনোই পাবেন না। আপনার মা, বোন, প্রেমিকা, সহধর্মিণী, কন্যা কিংবা আপনার খুব আপন কেউ- সবাই পাবলিক

ট্রান্সপোর্টে যাতায়াত করে। আপনার পাশে বসে থাকা মেয়েটাও কারো না কারো বোন, কারো না কারো মেয়ে। তাকে বস্তু নয়, মানুষ হিসেবে দেখুন। মানুষ হিসেবে তার প্রাপ্য সম্মানটা দিন। আপনি তাকে তার প্রাপ্য সম্মান দিলে আপনার কাছের মানুষগুলোও অন্যদের কাছ থেকে তার প্রাপ্য সম্মানটা পাবে। আপনি নিশ্চয়ই সেটা চাইবেন?

লেখকঃ শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়  

***প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ইনিশিয়েটর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ইনিশিয়েটর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।