প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » আগে মানুষ ধার্মিক ছিল, ধর্মান্ধ না

আগে মানুষ ধার্মিক ছিল, ধর্মান্ধ না

প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারী ২০১৮১০:০৪:৪৬ অপরাহ্ন

শ্রাবণী ইন্দু চৌধুরী

একটু আগে লাইভ শুনছিলাম শ্রদ্ধেয় আব্দুল গাফ্ফার চোধুরীর কথা। তিনি বলছিলেন একসময় বাংলাদেশে ছিলো ‘তোমার ধর্ম তোমার আর আমার ধর্ম আমার’। এই নিয়ে কোন মারামারি কাটাকাটি ছিলো না। আমার শৈশব, কৈশোর, রোকেয়া হলের দিনগুলো এভাবেই কেটেছে।

আমার রুমমেট নামাজ পড়তো ঘরে। আমার টেবিলের উপর মা কালির একটা ছবি ছিলো। আমার রুমমেট কোনদিন আমাকে বলেনি ” এই ছবি সরিয়ে রাখ, আমার নামাজ হবে না”। ওর মাথায়ই ওই কথা আসেইনি। আমার সালমা মাসির ( যাকে আমি আমার মা মনে করি) জায়নামাজে বসে ঘন্টা ধরে গল্প করেছি। আসলে সেই সময় এধরনের ভেদাভেদ ছিলো না। আজ আমি যা, সেটা হতে আমার বাবা, মা ছাড়া আমার এই মাসিমা, কাকাবাবুর অবদান অনেক।

আমরা যারা রোকেয়া হলে থাকতাম, সরস্বতী পুজোর সময় আমাদের অনুমতি ছিলো জগন্নাথ হলে যাবার। সকাল থেকেই সাজ সাজ রব। দল বেধে জগন্নাথ হলে যাওয়া। মুর্তি সাজানো, ফল কাটা, লাইন দিয়ে অঞ্জলী দেয়া আর তারপর দুপুরের খাওয়া। বিকেলে আবার যাওয়া, সন্ধ্যের সময় ফাংশন করে দল বেধে হলে ফেরা … এই ছিলো আমাদের সেই দিনের কর্মসুচি।পুরোটা সময় আমাদের সাথে ডঃ জি সি দেব থাকতেন। মাঝে মাঝে ফোড়ন কাটতেন ! পুজোয় অন্যান্য মুসলিম শিক্ষকরা ও ওনাদের স্ত্রীরাও থাকতেন। একবার আমাদের এক নামকরা শিক্ষয়ৈত্রী আমাকে হলে ফোন করে বলেছিলেন ওনার মেয়ে, যে আমারই ক্লাসমেট, যেন সরস্বতী পুজোয় অঞ্জলী দেয় ও পুজোর কাজে হাত দেয়। ও খুব চুপচাপ ছিলো। তাই ওর মা র চিন্তা ও কিছু শিখছে না !!

প্রতি পুজোয় আমার সাথে শামীম আর মনিকা থাকতো। শামীম বাড়ী থেকে আসতো। কোনদিন মাসিমা মেসোমসাই বলেননি ‘পুজোয় যাবি কেন?’ পুজোয়, ঈদে, বড়দিনে দল বেঁধে শাড়ী কিনেছি। পরবর্তিতে রোকেয়া আর আমি ঈদে, পুজোয় একসাথে বেড়াতাম। রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজ আমাদের দুজনকে নেমন্তন্ন করে খাওয়াতেন।

রোকেয়া হলের কাছেই ছিলো বুড়ো শিব বাড়ী। শিবপুজোর দিন শিবের মাথায় জল ঢালার সময় রোকেয়া হলের মেয়েদের ভীড় ছিলো বেশী। রোকেয়া হলের মেয়েদের জন্য আলাদা লাইন হতো কারন তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।
আমাদের মধ্যে সম্প্রীতি ছিলো অন্যরকম। আমরা নিজেদের নামে পরিচিত ছিলাম। ধর্ম দিয়ে নয় !!!

আমি সিলেটি। কোনদিন জলালী কবুতর খাইনি। কারন শাহ্জালালের মাজারের কবুতর। আমার বাবা বারন করেছিলেন। আজমীরে গিয়ে মাজারে গেছি। আবার আমার বন্ধু একবার কালিঘাটে গিয়ে কালিপুজো দিয়েছিলো। বিশ্বাস হলো যার যার একান্ত ব্যক্তিগত অনুভুতি। ধর্ম এতো ঠুনকো নয়।কিছু হলেই “গেল গেল” রব ওঠে !! মানুষ যতো শিক্ষিত হচ্ছে, গোড়ামি তত বাড়ছে।

আমি এমন এক সময়ে জন্মেছি, যখন মানুষ ধার্মিক ছিলেন, ধর্মান্ধ ছিলেন না। আমি নিজেকে ভগ্যবান মনে করি। আমি মানুষ হিসেবে জন্মেছি, মানুষ হিসেবে চলে যেতে চাই।

 

(Published as part of Social Media Campaign #BeHumaneFirst to promote Secularism in Bangladesh)

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ইনিশিয়েটর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ইনিশিয়েটর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।***

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।