প্রচ্ছদ » অনিয়ম » মেট্রোরেল প্রকল্প এবং আমাদের উন্নয়ন

মেট্রোরেল প্রকল্প এবং আমাদের উন্নয়ন

প্রকাশ : ৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮১০:১৩:২১ অপরাহ্ন

খাতুনে জান্নাত

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে বহু বছর ধরে যানজট বলা যায় সর্বোচ্চ অবস্থানেই আছে। এই সমস্যা কমার তো কোনো নাম নেই, বরং দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে রাজধানীতে সমস্যাটা বেশি;যেখানেই যাই না কেন তিন ঘন্টা হাতে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে বাংলা সিনেমার নায়কের মতো অনেকটা স্পাইডারম্যান স্টাইলে লাফ দিয়ে বাসে না উঠতে পারলে আর সেদিন যাওয়া হবে না! শুধু কী তাই? লাফ দিয়ে বাসে উঠতে জানলেই তো শুধু হবে না, তারপর আবার বাদুড়ের মতো ঝোলাও জানতে হবে।

আমার গ্রাম থেকে ঢাকায় আসতে লাগে মোটামুটি তিন ঘন্টার মতো। আর ঢাকায় আসার পর সদরঘাট থেকে বাসায় পৌঁছাতে লাগে আড়াই ঘন্টা অন্তত! এই হলো অবস্থা।

এই অবস্থায় কেউ যদি আমাকে বলে আমাদের আর এই অবস্থা থাকবে না, ওয়ান ফাইন মর্নিং আর এসব কিছু থাকবে না, আমি ঘুম থেকে উঠে আরামসে ঢিলোঢালাভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে ১২ মিনিটের মধ্যে শাহবাগ পৌঁছে যেতে পারব, তাহলে আমি দুটো কাজ করতাম। হয় তাড়াতাড়ি ওই লোকের থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতাম, আর নয়তো তাকে সাইকিয়াস্ট্রিস্টের নাম্বার দিয়ে অতি দ্রুত যোগাযোগ করতে বলতাম! কারণ এই দেশে বসে বসে এসব কথা বলা হলে বাচ্চাদেরকে রূপকথার গল্প শোনানোর সমতুল্য!

কিন্তু এখন আর আমি তাই করব না। আপনিও করবেন না জানি। কারণ আমরা জেনে গেছি সেই রূপকথা এখন সত্যি হতে চলেছে। ২০১৯ সাল নাগাদ মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ শেষ হলে আমাদের দীর্ঘদিনের কষ্টের অবসান হবে। সেই সময়ের আনন্দের কথা চিন্তা করে হলেও এখন যাত্রাপথের কষ্টগুলো তুচ্ছ লাগে!

মেট্রোরেল প্রকল্প বলতে গেলে আমাদের জন্য অনেক বড় একটা ব্যাপার। অনেক ফ্লাইওভার, ট্রাফিক নিয়ম-কানুন দিয়েও যে সমস্যাটা কিছুতেই সমাধান করা সম্ভব হচ্ছিলো না, মেট্রোরেলের মাধ্যমে খুব সহজেই সেটা সমাধান করা সম্ভব। আমরা মেট্রোরেল করে নিজেদের দেশের যানজট সমস্যা দূর করছি বা সেই ক্ষমতা আমাদের হয়েছে, নিঃসন্দেহে ব্যাপারটা গর্বের বিষয়।

তবে এই প্রাপ্তিটার জন্য আমাদের অনেক কিছু বিসর্জন দিতে হয়েছে। রাস্তা কমে যাওয়ার কারণে যানজট বৃদ্ধি পেয়েছে, রাস্তা উঁচু-নিচু হয়ে যাওয়ায় বাস চলার সময় মনেহয় ১০ টাকায় রোলার কোস্টারে উঠেছি (!), ধূলোয় চারপাশ ঢেকে থাকে, এসব না’হয় বাদ দিলাম। আর একটা তো বছর, ঠিক কষ্ট করে কাটিয়ে দিতে পারব ভেবে ছেড়ে তো দিলাম। কিন্তু মেট্রোরেলের জন্য যে রাস্তার পাশের গাছগুলো সব কেটে ফেলা হচ্ছে তার কী হবে? এটা কী করে মেনে নেই?

একটা দেশে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য সেই দেশে ২৫ ভাগ বনভূমিচ প্রয়োজন। ক্লাস থ্রি থেকে তাই পড়ে আসছি তোতাপাখির মতো। কিন্তু আমাদের দেশে কত আছে? খুব ভালোমতো হিসাব করলে মাত্র ১৩ শতাংশ! সুজলা-সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলাদেশে নাকি মাত্র ১৩ শতাংশ বনভূমি! এমনেই তো নেই, তার উপর এটা-ওটা-সেটার অজুহাতে আরও গাছ কাটছি! আমরা নিজের ভালো কবে বুঝব? আর কতদিন যে ডালে বসে আছি সে ডালই কেটে যাবো?

আমাদের সুস্থভাবে শ্বাস নেবার জন্য বায়ুমন্ডলে অন্তত ২০ শতাংশ অক্সিজেন দরকার। আমাদের বায়ুমন্ডলে ২০ শতাংশ অক্সিজেন তো নেই-ই, বরং আরও কমছে। দেখা যাবে একদিন ঢাকায় বসবাসকারী সকল মানুষ শ্বাসকষ্ট রোগে আক্রান্ত! ভালোই হবে একদিক দিয়ে, সবাই সবার কষ্টে শামিল হতে পারবে।

মেট্রোরেল আমাদেরকে নিঃসন্দেহে উন্নয়নের আরও একধাপ ওপরে নিয়ে যাবে, কিন্তু সেই উন্নয়ন কার জন্য যখন আমরাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব? এই উন্নয়ন দিয়ে কী করব আমরা? প্রতিটি প্রজেক্টের জন্য যে হারে গাছ কাটা হচ্ছে সেই হারে কি লাগানো হচ্ছে? ভাবার সময় এখনই, শোধরানোর সময় এখনই। যেই সময়টা এখন আমরা পার করছি তা আর ফিরে আসবে না। একদিন যেন এমন না হয় যে জাতিগতভাবে উন্নয়নের শীর্ষে থাকার পরেও আমাদের অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে নিয়ে ঘুরতে হয়!

ছবিঃ উল্লাহ খান অনন্ত

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।