প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » শুধুই মেয়ে কিন্তু মানুষ নও

শুধুই মেয়ে কিন্তু মানুষ নও

প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৮১০:০৭:৫৯ অপরাহ্ন

তুষপি ইসলাম ঝুমা

আপনি কি জানেন একটা মেয়েকে প্রতিদিন, প্রতি টা মুহূর্তে কি পরিমাণ অসম্মানিত হতে হয় এই সমাজ থেকে শুধুমাত্র সে একজন মেয়ে বলে? একটি মেয়ে রাস্তায় বের হলে তাকে কি পরিমান বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলতে হয় কখনো ভেবেছেন ?

রাস্তার রিক্সাওয়ালা থেকে শুরু করে ছোট ছোট ছেলেরাও বাকি থাকে না তাকে জানান দিতে যে আসলে তারা মেয়েটিকে কোন দৃষ্টিতে দেখছে!

পাশ দিয়ে হেটে যেতে ফিস ফিস করে বলে যায় বড় কেন? ছোট কেন? সাইজ কত? হাত পরে নাই? বুঝা যায় না কেন, হিজরা নাকি? আয় বড় করে দিই? ভাল্লাগছে, রেট কত? চু চু , উ , আ ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি শব্দ করে।

রাস্তা পার হবার সময় পিছনে, কোমরে হাত দিয়ে চলে যায় , রাস্তায় ঠিক মত হাঁটা যায় না, ইচ্ছে করে বুকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয় কখন যেনো ভিড়ের মাঝে কোন কুকুর খামচে দেয়।

তখন নিজেকে কতটা অসহায় লাগে , নিজের দেহটাকেই নিজের কতটা ঘেন্না হয় জানেন ? ইচ্ছে করে মাটির নিচে চলে যাই , নিজেই নিজেকে শেষ করে দিই।

বার বার প্রশ্ন জাগে মনে কেনো ? আমি কি দোষ করেছি? ওরা কেনো আমার এই দেহটাকে এভাবে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে চায়?
কেননা শুধু মাত্র আমি মেয়ে বলে?

আর এ দেহটাত আমার নিজ হাতে গড়া না, সৃষ্টিকর্তার দান, সৃষ্টিকর্তা একজন মেয়ের শারীরিক গড়ন এ ভিন্নতা রেখেছেন একজন ছেলের চাইতে , এটা কি আমার দোষ ? এইসব নোংরামিগুলোর সম্মুখীন হলে চোখে পানি চলে আসে। তখন আর এক পা ও সামনে যেতে ইচ্ছে করে না।

শুধু রাস্তা নয় , চাকরী বলেন , বাসা বলেন , স্কুল কলেজ সব জায়গাতেই একটি মেয়েকে বার বার চারপাশটা জানিয়ে দেয় যে তুমি একটি মেয়ে, শুধুই একটা মেয়ে কিন্তু মানুষ নও!!!
জন্মের শুরু থেকেই ১ টা মেয়ের সমাজে টিকে থাকার লড়াই শুরু হয়ে যায়।

সমাজ ও পুরুষ জাতির অভিযোগ মেয়েরা নাকি ছোট ছোট জামা কাপড় পরিধান করলে উনারা নিজেদের কন্ট্রোল রাখতে পারেন না। সৃষ্টিকর্তার সকল সৃষ্টির মধ্যে মানুষ নাকি শ্রেষ্ঠ কেননা তাদের বিবকে দেয়া হয়েছে। তবে প্রত্যেক প্রানীর মাঝেই জৈবিক চাহিদা রয়েছে , মানুষ তাদের জৈবিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম করে নিয়েছেন এই যেমন বিবাহ প্রথা কিন্তু অন্যান্য প্রানীর ক্ষেত্রে এরা এ ধরনের কোন নিয়ম অনুসরন করে না।

তার মানে কি দাঁড়াচ্ছে ? যেহেতু মানুষ রুপি জানোয়ারগুলো নিজেদের কন্ট্রোলই করতে পারে না , অন্যান্য প্রানীদের মত কাল, পাত্র্‌, অবস্থান এসব না মেনে জৈবিক চাহিদাটাই মুখ্য তাদের কাছে তাহলে তারা আসলে মানুষই না , আর তাই তারা নারী জাতি কি ধরনের পোশাক পরিধান করবে সে ব্যাপারে কথা বলার কোন যোগ্যতাই রাখে না।

একজন মেয়ে সে যে মেয়ে সেটা প্রমাণ করার জন্য তাকে বড় বড় চুল রাখতে হবে, বড় বড় আলখেল্লা পরতে হবে , ওড়না নিতে হবে , সর্বদা বুক ঢেকে রাখতে হবে, মেকাপ করে সঙ সেজে দুনিয়াকে ইমপ্রেস করতে হবে, লুতুপুতু হতে হবে। আর ভাল মেয়ে হতে হলে হলেতো ঘর থেকে না বের হয়ে পুতুল এর মত যা বলবে তাই মানতে হবে বেদ বাক্যের মত।

কি আজীব সমাজরে ভাই , এখানে জামা কাপড় গড়ন পরনে পরিচয় পেতে হয় , নারীর শরীরের ইঞ্চি ইঞ্চি চামড়ায় সততার নোংরা সন্ধান দিতে হয়!

একটা মেয়ে খেতে বসলে সেখানে বসা থেকে শুরু করে কিভাবে খাবে ,কিকি খাবে, কত টুকু খাবে সেটাও অন্যরা তাকে নির্ধারণ করে দিবে! শুধু খাওয়া নয় , সে কিভাবে ঘুমাবে , কিভাবে হাঁটবে , হাসবে , কথা বলবে , তাকাবে সবই অন্যরা নির্ধারণ করে দিবেন। ঘুমানোর সময় রোবটের মত ভদ্রভাবে ঘুমাতে হবে, পাশের মানুষের উপর হাত-পা তো ভুলেও যাওয়া যাবে না , নয়তো শুলে চড়ানো হবে। মেয়েকে অবশ্যই ধীরে ধীরে হাঁটতে হবে, আস্তে আস্তে কথা বলতে হবে , জোরে শব্দ করে হাসা যাবে না , কারো চোখের দিকে তাকায় কথা বলা যাবে না। এক কথায় একটা রোবট!

তাছাড়া মেয়েদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের দিকে তাকিয়ে থাকা তো আছেই।এমন ভাবে তাকায় থাকে যেনো পুরুষদের চোখে অনুবীক্ষণ যন্ত্র লাগানো তাই উনারা জামার উপর দিয়েই সব দেখতে পারছেন , কিংবা কোন জামা কাপড়ই পরেনি মেয়েটি , কিংবা কোন লোভনীয় খাবার দেখছেন , শকুনের মত ছোবলের অপেক্ষায় আছে।
এক্ষেত্রে আমি অবশ্য একটা কথা বলে থাকি “ বঙ্গ নারীর বক্ষদেশ বঙ্গ মিউজিয়াম কিনা তায় বঙ্গ পুরুষ হেরিতে নারি আখি”

না না এখানেই শেষ নয়, আরো আছে। একটা মেয়ে জন্মের পর তাকে তার পরিবার থেকে প্রথম কি কি করা যাবে না সেই ফর্দ শেখানো হয়। এবং সে যে মেয়ে তাকে বার বার সেটা মনে করিয়ে দিয়েই বড় করা হয়। কোন মেয়ে যদি এইসব নিয়মের বাইরে যায় তাহলে তো তার শনির দশা নিশ্চিত। সমাজ ,পুরুষ সমাজ , আশে পাশের আন্টি সমাজ বখে যাওয়া কিংবা সোজা বাংলায় বেশ্যা উপাধি দিয়ে বসেন।

এমন কি একজন মেয়ে কখন বিয়ে করবে, কাকে বিয়ে করবে সেটাও অন্যরা ঠিক করবে, কোন মেয়ে কাউকে নিজের জীবন সঙ্গিনী হিসেবে পছন্দ করলে সে মেয়ে খারাপ হয়ে যাবে , কিন্তু কোন ছেলে ১০ টা প্রেম করলেও কিচ্ছু যায় আসবে না। এমন কি কোন মেয়ের ডিভোর্স হয়ে গেলেও সব দোষ মেয়েরই হয়।

ও হ্যাঁ আরেকটা কথা, পুরুষশাসিত সমাজের মতে মেয়েদের জীবন নাকি পানির মত সহজ, তাদের জীবনে কোন কষ্টই করতে হয় না। আসলে একজন ব্যক্তি যখন নিজের গালে চড় খাবেন তিনি শুধুমাত্র তখনই বুঝতে পারবেন গালে চড় পরার স্বাদ টা কতটা সুখকর; এই পুরুষসমাজ তো আদি থেকেই চড় দিয়ে আসছেন তাই এদের কাছে ঐ চড় দেয়া আর চড় খাওয়া দুটোরই এক স্বাদ মনে হয়।

জ্বী মেয়েদের জীবন এত সহজ যে ১টা মেয়েকে তার শুরু থেকে শেষ অব্দি তার নিরাপত্তার জন্য লড়াই করে যেতে হয়, এমন কি তার পরিবারেও সে তার নিরাপত্তার জন্য লড়াই করে।

আপনাদের মতে মেয়েদের তো কিছু করতেই হয় না, বাবার টাকায় ৪০% লাইফ চালায়, বাকি ৬০% বরের টাকায়। তাই তাদের তো কোন চিন্তাই করতে হয় না। জ্বী এই বিয়েটা যে কত মজার সেটা শুধুমাত্র একটা মেয়ের পক্ষেই জানা সম্ভব যখন না সে শারীরিক সম্পর্কের জন্য আদৌ মানসিকভাবে প্রস্তুত কিনা সে মতামত না নিয়ে শুধুমাত্র বরের মতামতটাই মুখ্য থাকে।এই সমাজে এখনো এমন অনেক নারী আছেন যারা প্রতিনিয়ত এই ধরনের অত্যাচার গুলো নীরবে সহ্য করে যাচ্ছেন শুধুমাত্র সমাজের মানুষগুলোর কাছ থেকে ভালো বউ সার্টীফিকেট পাওয়ার জন্য , তা নয়তো সমাজ তাদের খারাপ বলবে তো , মাগী বেশ্যা ইত্যাদি উপাধি দিয়ে বসবেন তো।

ও হ্যাঁ , বরের রাগ উঠলে সে রাগ বউয়ের উপর ঝারা যাবে, এমন কি বর বউ এর গায়ে হাত ও তুলতে পারবেন কিন্তু বউ কখনো বরের গায়ে হাত তুলতে পারবেন না !
কেনরে ভাই বর কি ফেরেশতা আর বউ কি টিস্যু যখন ইচ্ছা যেভাবে ইচ্ছা যে কাজে ইচ্ছা ব্যবহার করবে?

আমাদের মা সমাজ বলে থাকেন, এইসব কিছু না মা, মেয়ে হয়ে জন্মালে এইসব সহ্য করে নিতে হয়, মেয়েদের জীবনটাই এমন !
এভাবে আর কত! এরকম ইমোশনাল ব্লাকমেইল না করে বরং তাঁকে সাহস দিলে কি হয় ?

আর হ্যাঁ এই যে সমাজের নিয়ম গুলো দেখছেন না, এইগুলো আকাশ থেকে ভূতে ফেলে দেয় নি, এ নিয়ম গুলো আমার আপনার আপনাদেরই মতো একদল মানুষ তাদের সুযোগ সুবিধার জন্য তৈরি করেছিলেন,তাই এগুলো বেদ বাক্য হিসেবে মানার কোন কারণ আমি দেখি না।

অনেক তো হল শুধু “মেয়ে” হয়ে বাঁচা , এবার বোল পাল্টাও, মাথা উঁচু করো নারী, দৃষ্টি তোমার সম্মুখে রাখো, আর বাঁচার ঐ দুটো দিনই তুমি মানুষ হয়ে বাঁচো।

***প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ইনিশিয়েটর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ইনিশিয়েটর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।