প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » এমন দেশ আর কোথায় পাবেন আপনি?

এমন দেশ আর কোথায় পাবেন আপনি?

প্রকাশ : ৫ মার্চ ২০১৮১০:২৬:৪৪ অপরাহ্ন

খাতুনে জান্নাত
অন্যমনস্কভাবে নিউজফিড স্ক্রল করছিলাম। হঠাৎ একটা পোস্টে চোখ আটকে গেল। কেউ একজন স্ট্যাটাস দিয়ে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলা হয়েছে। বুঝতে কিছুটা সময় লাগলো। কার ওপর? মুহম্মদ জাফর ইকবাল? আমাদের জাফর ইকবাল স্যার?

সাথেসাথে টিভি খুলে দেখলাম সব চ্যানেলের ব্রেকিং নিউজে ফুটে উঠছে সেই ভয়াবহ খবর। স্যারের ওপর হামলা! মাথায় আঘাত লেগেছে। গলায় কাছে কিছু একটা এসে দলা পাকালো। ভীষণ অসহায় লাগলো নিজেকে। এ কোথায় আছি আমরা?

মৃত্যুর এই খেলা শুরু হয়েছে ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি হুমায়ূন আজাদকে দিয়ে। মাত্র ৩৩ বছর বয়স যেই দেশটার, যে দেশটা নাকি স্বপ্ন দেখবে সবকিছু সুন্দরমতো সাজিয়ে নেয়ার, সে দেশে কিনা একজন লেখকের ওপর জনসমুক্ষে হামলা করা হয়!

বিদেশে নিবিড় চিকিৎসার মাধ্যমে হুমায়ূন আজাদ কিছুটা সুস্থ হন। জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (বা সংক্ষেপে জেএমবি) নামক ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের একজন শীর্ষনেতা শায়খ আব্দুর রহমান পরবর্তিতে হুমায়ুন আজাদ এবং একইসাথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম ইউনুসকে হত্যার নির্দেশ দেবার কথা স্বীকার করে। এই হত্যা প্রচেষ্টার মামলা দ্রুত শেষ করার জন্য উচ্চ আদালত ফেব্রুয়ারি ২০১৪ তে আদেশ প্রদান করে।

এই হলো শুরু। এরপর বেশ কয়েকবছর বিরতির পর ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঘটে দ্বিতীয় হামলা। অনলাইন লেখক রাজিব হায়দার রাজধানীর পল্লবী থানার কালশীর পলাশ নগরে নিজ বাসার সামনে তিনি দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত হন।

এরপর আর থেমে থাকে নি দূর্বৃত্তরা। বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষের দিনে দিনে বৃদ্ধি কিংবা প্রশাসনের অক্ষমতা – যে কারণেই হোক না কেন ঘটিয়ে গেছে একের পর এক হত্যাকান্ড। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঘটে আরেকটি খুনের ঘটনা। সে রাতে বাংলা একাডেমির বইমেলা শেষে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হন বিজ্ঞানলেখক অভিজিৎ রায়। গুরুতর আহত হন তার স্ত্রী রাফিদা আহম্মেদ। ২০১৫ সালের ৩০ মার্চ রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার বেগুনবাড়িতে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় অনলাইন লেখক ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে। ২০১৫ সালের ১২ মে সিলেটের সুবিদবাজারের নুরানি আবাসিক এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় অনন্ত বিজয় দাশকে।

২০১৫ সালের ৭ আগস্ট দিনেদুপুরে রাজধানীর পূর্ব গোড়ানের ১৬৭ নম্বর বাড়ির পাঁচ তলায় কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয় নিলাদ্রী চ্যাটার্জি ওরফে নিলয়কে। ৩১ অক্টোবর আজিজ সুপার মার্কেটের তিন তলায় জাগৃতির প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দিপনকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা তার অফিস কক্ষেই তালাবদ্ধ করে চলে যায়। ঠিক একই সময় লালমাটিয়ায় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান শুদ্ধস্বর’র কার্যালয়ে ঢুকে সেখানে প্রকাশক টুটুলসহ তিনজনকে কুপিয়ে ও গুলি করে আহত করে। এ দু’জনই নিহত অভিজিতের বইয়ের প্রকাশক ছিলেন। ২০১৬ সালের ৬ এপ্রিল রাতে রাজধানীর লক্ষ্মীবাজার এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র নাজিম উদ্দিন সামাদকে।

এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন হয় “মুক্তমনা” নামক নিজস্ব সৃষ্টি ব্লগের লেখক অভিজিৎ রায়ের ওপর হামলার ঘটনায়। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একুশে বইমেলা থেকে বের হওয়ার সময় অজ্ঞাত সন্ত্রাসীরা তাকে কুপিয়ে হত্যা ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা কে আহত করে।

২০১৫ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যাবেলায় অভিজিৎ ও তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা একটি রিকশায় করে একুশে বইমেলা থেকে বাড়ি ফেরার সময় সাড়ে আটটা নাগাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের নিকটে অপরিচিত দুস্কৃতিকারীদের দ্বারা আক্রান্ত হন। সাক্ষীদের মতে, দুইজন দুষ্কৃতিকারী তাঁদের থামিয়ে রিকশা থেকে নামিয়ে রাস্তায় ফেলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁদের কোপাতে থাকেন। অভিজিতের মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। তাঁর স্ত্রীর কাঁধে ধারালো অস্ত্রের আঘাত লাগে এবং বাম হাতের আঙুলগুলি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। উভয়কে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ নিয়ে যাওয়া হলে অভিজিৎ রাত সাড়ে দশটা নাগাদ মৃত্যুবরণ করেন। রাফিদা আহমেদ বন্যা চিকিৎসার পর বেঁচে যান।

অভিজিতের মৃত্যুর একদিন পরে আনসার বাংলা-৭ নামক একটি সংঘঠন এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে। অভিজিতের পিতা অজয় রায় ২৭শে ফেব্রুয়ারি শাহবাগ থানায় হত্যার অভিযোগ দায়ের করেন।

এই হলো মোটামুটি চিত্র। এর বাইরে আরও গল্প তো আছেই। আর সর্বশেষ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, আমাদের মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের ঘটনাটা তো আছেই!

স্যারের ওপর হামলা করার পরই হামলাকারী যুবককে আটক করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। হামলাকারীর নাম ফয়জুর রহমান। বয়স ২৪। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী কুমারগাঁওয়ের শেখপাড়ার বাসিন্দা। তাঁর মূল বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই। এলাকাবাসীর মতে, ফয়জুল মাদ্রাসা শিক্ষার্থী বলে এলাকায় পরিচয় দিতেন। তবে কোন মাদ্রাসায় পড়তো সে ব্যাপারে তারা একেবারেই অজ্ঞ!

কেন এই হত্যাকান্ড? মানুষ হয়ে মানুষকে কেন আমরা শেষ করে ফেলতে চাইছি? মুহম্মদ জাফর ইকবালকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছিল সেই ১৯৯৯ সাল থেকেই। আর আজ তারা হত্যার চেষ্টাও করে ফেললো! হামলাকারী যুবক বলেছে স্যার নাকি ইসলামের শত্রু, স্যারের ওপর সে কারণে সে হামলা করেছে! কী দারুণ যুক্তি! আচ্ছা, এমন কথা আমি অনেকজনকেই বলতে শুনেছি যে স্যার নাকি ইসলামের শত্রু। আপনি যদি সেই দলের হয়ে থাকেন তবে আপনাকেই বলছি, স্যারের ইসলাম বিরোধী একটা লেখা বের করে দেখাবেন দয়া করে?

যদি ধরেও নেই একটা মানুষ নাস্তিক, তাতে কী আসে-যায়? নাস্তিক হলেই তাকে মেরে ফেলার অধিকার কি আমার জন্মে যায়? আমি যদি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী হয়, তবে কি কেউ আমাকে মেরে ফেলতে আসে? তাহলে নাস্তিক হলে কেন আমার তাকে মেরে ফেলতে হবে?

জানি না দেশটার কী হয়েছে। তবে দেশটা ভালো নেই। এদেশের স্বাধীনতা এনে দিল যেই দৃঢ়চেতা মানুষটা, তাকে আমরা স্বাধীন হওয়ার চার বছরের মাথায় শেষ করে দিলাম। আমরা এদেশে কোনো মুক্তচিন্তার মানুষকে থাকতে দিতে চাই না। সবাইকে আমার মতো হতে হবে, কেউ অন্যরকম করে ভাবতো পারবে না – এই হলো আমাদের ধ্যান-ধারণা! অন্যরকম হলেই তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেব! কলমের সঠিক ব্যবহার না শিখলেও চাপাতি-ছুরির ব্যবহার আমরা ঠিকই শিখেছি!

শেষ করি একটা কথা দিয়ে। স্যারকে ওটিতে নেয়ার সময় স্যার বলেছিলেন, “হামলাকারী কেমন আছে? ওকে যেন বেশি মারধোর না করা হয়।”
এই মানুষটাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলাম আমরা। আরও অনেককে মেরে ফেলতে চাই আমরা, মেরে ফেলেছিও। শুধুমাত্র আমাদের সঙ্গে চিন্তা না মেলার অপরাধে! আমরাও মানুষ, সাদা চুল আর গোফের ওই লোকটাও তো মানুষই, তাই না?

এমন দেশ আর কোথায় পাবেন আপনি?

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।