প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » বাবা মায়ের ইচ্ছা বনাম সন্তানের স্বপ্ন

বাবা মায়ের ইচ্ছা বনাম সন্তানের স্বপ্ন

প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০১৮৩:২৬:৩৭ অপরাহ্ন

কাজী মোয়াজ্জমা তাসনিম

বাবা- মায়ের স্বপ্ন ছিল একমাত্র মেয়েকে ডাক্তারি পড়াবে। সে যেভাবেই হোক। প্রাইভেট মেডিকেল হলেও সই। কিন্তু আমার যে জীববিজ্ঞানের সাথে জনম জনম শত্রুতা! কিছুতেই বিষয়টাকে রপ্ত করতে পারতাম না।  একরকম বিদ্রোহ করে ভর্তি পরীক্ষার সময় বিভাগ পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিলাম। সৌভাগ্যক্রমে সুযোগও পেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পড়ার। তারাও খুশি। আবার খুব খুশিও না। ডাক্তারিটা পড়লেই বোধহয় ভালো হত আরেকটু…..।

এটা কিন্তু নতুন কিছু না। এই দেশের প্রত্যেকটা ছেলেমেয়ের জীবনের গল্পটা কোন না কোনভাবে এর সাথে মিলে যায়। পরিবারে সন্তান জন্ম নেওয়ার পরপরই সেই সন্তানকে ঘিরে বাবা মা তাদের নিজস্ব স্বপ্নের জগত গড়ে তোলে। তারা চায় তাদের সন্তানও সেই জগতের বাসিন্দা হোক। চাইতে চাইতে এক সময় ভুলেই যায় সন্তানের নিজের কোন চাওয়া থাকতে পারে। তারা কখনোই মানতে চান না সন্তানের নিজের তৈরি একটা জগত থাকতেই পারে। যে জগতটা তাদের জগত থেকে আলাদা।

একজন বাবা কিংবা একজন মায়ের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হচ্ছে তাদের সন্তান। সন্তানের খারাপটা আসলে কেউই চায় না। প্রতিটা বাবা মা চায় তার সন্তান থাকুক দুধে ভাতে। একটা নিরাপদ ভবিষ্যত, একটা ভালো থাকার নিশ্চয়তা। কিন্তু ভালো থাকার সংজ্ঞাটা সব মানুষের কাছে এক না। যে ছবি এঁকে ভালো থাকতে পারে সে ব্যাংকে ভালো থাকতে পারবে না। ক্রিকেট যার প্যাশন সিএসই তার গলায় কাঁটার মতই বিঁধবে। সরকারী চাকরি গায়ক ছেলেটাকে একটা নিশ্চিত ভবিষ্যত দেবে ঠিকই, ভালো থাকাটা আর হবে না।

সন্তানের মঙ্গল কামনার নিচে এরকম শত কোটি স্বপ্ন পিষ্ট হচ্ছে প্রতিদিন। ভবিষ্যতের চিন্তায় প্রতিভাগুলো ঝরে যাচ্ছে অকাতরে। অথচ নিজেকে প্রমাণের সামান্য সুযোগটা পেলেই দেশে সৃজনশীল মানুষের জন্য হাহাকারটা তৈরি হত না।

এদেশে বাবা মায়েরা সন্তানের কবিতার খাতা পুড়ে ফেলে, ছবি আঁকার ক্যানভাস নষ্ট ফেলে, ক্রিকেট ব্যাট ভেঙে ফেলে, গিটার বিক্রি করে দেয়, গল্পের ডায়েরি ছিঁড়ে ফেলে। তারপর কাঁধে চাপিয়ে দেয় শরীরের চেয়ে দ্বিগুণ ওজনের ব্যাগ। প্রাথমিক লেভেল থেকে আধডজন সাবজেক্ট, বস্তা বস্তা গাইড বই, প্রতিটা সাবজেক্টের জন্য আলাদা টিচার, কোচিং ক্লাস সাথে অমুক ভাবি তমুক ভাইয়ের বাচ্চাটা টিউটোরিয়াল পরীক্ষায় দুই নম্বর বেশি পেয়েছে সেই কেচ্ছাকাহিনী শোনানোর পর্ব তো আছেই। মাথায় ঢুকে যায় অসুস্থ প্রতিযোগিতা, কোনরকম খেয়ে পরে বাঁচার চিন্তা। তাই দেখে স্বপ্নেরা বাপ বাপ করে পালায়। তাতে হয়ত একজন করদাতা বাড়ে, ভোটার বাড়ে, মানুষ বাড়ে না। ফলাফল, দেশ উন্নয়নশীলের মর্যাদা পায়। তার আনন্দ মিছিলে যৌন হয়রানির শিকার হয় মেয়েরা। আপাতদৃষ্টিতে ব্যাপারগুলো আলাদা মনে হলেও সব আসলে একই সূত্রে গাঁথা।

তো যা বলছিলাম। পশুরা কিন্তু স্বপ্ন দেখে না। মানুষ তো দেখে! সেই স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে শুধু খেয়ে পরে বেঁচে থাকাটাই যদি জীবন হয় তাহলে মানুষের জীবনের সাথে পশুর জীবনের পার্থক্য কী? মানুষের ভালো থাকার সংঙ্গা কী আসলে?

বর্তমান পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য অর্থনৈতিক আর সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টা কোনভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। আমাদের সমাজে সৃজনশীল মানুষদের এই নিরাপত্তাটা নেই সেটাও খুব বেশি সত্যি। একটা অনিশ্চিত জীবনের দিকে পিতা মাতা তাদের সন্তানকে ঠেলে দেবেনই বা কেন? আমরা জাতি হিসেবে খুব অদ্ভুত। নিজেরা সৃজনশীলতাকে গলা টিপে হত্যা করছি, তারপর দিনশেষে হাপিত্যেশ করি জন লেনন কিংবা ভ্যানগগরা কেন এই দেশে জন্মায় না। কংক্রিটের দেয়াল বানিয়ে আশা করি দেয়াল ফুঁড়ে একদিন কৃষ্ণচূড়া গজাবে!

ছোট ভাই- বোনেরা প্রায়ই এই ব্যাপারগুলো নিয়ে আমার কাছে আসে। টিনএইজের টালমাটাল সময়টাতে যদি নিজের স্বপ্ন আর নিজের পরিবার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায় তখন কতটা অসহায় লাগে আমি জানি। আমি কোন মোটিভেশনাল স্পিকার না। কিভাবে কী বলতে হয় আমি জানি না। শুধু নিজের জীবনে যে সূত্রটা প্রয়োগ করেছি সেটাই শিখিয়ে দেই ওদের। বলে দেই কখনো নিজের স্বপ্নটাকে মরতে দিও না। বুকের ভেতর জিইয়ে রাখো। বেঁচে থাকলে স্বপ্ন পূরণের সুযোগ একদিন না একদিন সামনে আসবেই। তার আগে পরিবারের সামনে নিজেকে প্রমাণ করতে শেখো। বিশ্বাস কর, পরিবার তোমার শত্রু না। তারা শুধু তোমাকে ভালো দেখতে চায়। তুমি নিজের মত করে তাদের ভালো থেকে দেখাও। আমি জানি এখানে একশো একটা ঝুঁকি আছে। একবার  হোঁচট খেলে টেনে তোলার কেউ থাকবে না। নিজে নিজে উঠে আবার শুরু করাটা অনেক বেশি কষ্টের। তবুও একটা ঝুঁকি নিয়েই ফেল না! দেখ কী হয়!

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।