প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » দেবী’ বনাম ‘একটি ধর্মান্ধ মুসলিম জনপদ

দেবী’ বনাম ‘একটি ধর্মান্ধ মুসলিম জনপদ

প্রকাশ : ৩১ মে ২০১৮১০:২৩:১১ অপরাহ্ন

ইস্পাহানির অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে এই ছবিটা সোমবার প্রকাশ করা হয়

খাতুনে জান্নাত
গত সোমবার ইস্পাহানি মির্জাপুর চায়ের অফিশিয়াল ফেইসবুক পেইজ থেকে একটি ছবি প্রকাশিত হয়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে একটি অব্যবহৃত টি-ব্যাগে দেবী সিনেমার পোস্টারের ছবি আঁকা হয়েছে। জানিয়ে রাখছি, ‘দেবী’ হলো বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলি সিরিজের প্রথম উপন্যাস, যা অবলম্বন করে অনম বিশ্বাসের পরিচালনায় এবং জয়া আহসানের প্রযোজনায় ‘C তে সিনেমা’ থেকে মুক্তি পেতে যাচ্ছে সিনেমাটি। সেই সিনেমার প্রচারণার অংশ হিসেবেই ইস্পাহানি মির্জাপুর থেকে এই অন্যরকম উদ্যোগটি নেয়া হয়েছে।

তবে এই দেশে মৌলিক কোনো উদ্যোগই প্রশংসা পায় না তা ধ্রুব তারার মতো জ্বলজ্বলে সত্য! শুধু তা নয়, না বুঝে কথা বলার লোকেরও এদেশে অভাব নেই। ফেইসবুকে তো বাকস্বাধীনতার দারুণ বহিঃপ্রকাশ করে চলেছে এদেশের মানুষ, যা শুধুমাত্র কমেন্টবক্স চেক করলেই যে কেউ বুঝে যাবে! সেই ধারাকে অব্যাহত রেখেই চলছে ইস্পাহানি মির্জাপুরের কমেন্টবক্সে ‘আমরা কতটা অশিক্ষিত’ – এই কথাটি প্রমাণ করার যুদ্ধ। শিক্ষিত যে কোন মানুষ যা দেখলে লজ্জা পাবেন যে সে কোথায় বাস করছেন!

দেবী একটি উপন্যাস, যা থেকে সিনেমা তৈরি হয়েছে – এটা না বুঝেই অসংখ্য মানুষ ইস্পাহানি মির্জাপুরকে গালিগালাজ করে কমেন্ট করছেন। কয়েকটি কমেন্ট হুবহু তুলে দেয়া হলো,

“#ইস্পাহানি_মির্জাপুর এটা #মুসলিম দেশ
আজ থেকে #ইস্পাহানি বর্জন করলাম”

“Ispahani Tea ও এর অন্যান্য পন্য এখন থেকে বর্জন করলাম”

“আমি মুছলিম তাই আমি মনে করি আমার জন্নো হারাম এই পন্নো”

“দেবী আসছে
টি ব্যাগে দেবী ভাসছে।”

“এটা মুসলিম দেশ”

“আমরা ঔ ছবি থাকলে কেনবোনা”

“এমন হলে তো এই চা আর পান করবো না! দেবীর নাম কেন!!?”

“এই পবিত্র মাসে এই রকমটা আপনাদের কাছ থেকে আশা করিনি! ইস্পাহানী মির্জাপুর বর্জন করলাম”

“এত কিছু থাকতে দেবী কেন? আজকের পর থেকে ইস্পাহানি চা আমার বাসায় ব্যবহার হবে না। ইনশাআল্লাহ।”

“ইস্পাহানীর জনপ্রিয়তা অচিরেই হারাবে।এই ফাজলামীর জন্য।মনে রাখতে হবে এটা মুসলিম অধ্যুষিত জনপদ।”

চমৎকার! কোথায় বাস করছি আমরা! এতগুলো মানুষের সমস্যা কারণ সেখানে ‘দেবী’ শব্দটা আছে। আর এতেই আমাদের দেশের মানুষের গায়ে আগুন ধরে গেল! তারা কমেন্টে নিজেদেরকে মুসলিম বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেললো! কেন রে ভাই? আপনি মুসলিম হয়েছেন বলে কী এদেশে অন্য ধর্মাম্বলবীরা থাকতে পারবে না? যদি এদেশে ইসলাম ধর্ম সংক্রান্ত টেলিভিশন অনুষ্ঠান হতে পারে, যদি সারাদেশে ধুমধাম করে ইসলাম ধর্মের উৎসব আয়োজিত হতে পারে, তবে অন্য ধর্ম সংক্রান্ত শুধু একটা শব্দ দেখে আমাদের অনুভূতিতে এত আঘাত লাগে কেন? এই চড়া অনুভূতি কোথায় থাকে যখন এদেশে সংখ্যালঘুদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়? এই চড়া অনুভূতি কোথায় থাকে যখন মন্দির কিংবা ধর্মীয় মূর্তি ভাঙ্গা হয় জনসমক্ষে? যদি সঠিক সময়ে আমাদের অনুভূতি কাজই না করে তবে এই কলসি কলসি অনুভূতি লইয়া আমরা কী করিব?

কমেন্টে লোকজন এতটাই মূর্খ আচরণ করেছে যে ইস্পাহানি মির্জাপুর চায়ের পেইজ থেকে কমেন্ট করে অফিশিয়ালি ক্ষমা চাওয়া হয়েছে। তারা কমেন্ট করেছেন, “আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত, দেবী একটি সিনেমার নাম যা হুমায়ূন আহমেদ এর কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত, খুব শীঘ্রই মুক্তি পাচ্ছে। আমরা সিনেমার একটি ছবি টি- ব্যাগ এ ধারণ করবার চেষ্টা করেছি মাত্র এবং এই ছবিটি করা হয়েছে একটি ব্যবহৃত টি ব্যাগ-এ”। এমনকি উপরের প্রতিটি কমেন্টে ইস্পাহানি মির্জাপুর চা থেকে এই কথা লিখে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। আশ্চর্য লাগছে, না? যেখানে না বুঝে যারা মূর্খ আচরণ করেছে তাদের লজ্জিত হয়ে ক্ষমা চাওয়ার কথা, সেখানে ক্ষমা চাচ্ছে কিনা ওই পেইজ থেকেই!

ভুল বানানে লেখা অদ্ভুত কমেন্টগুলো দেখে মনে হচ্ছে এদেশে শুধু আমরা সংখ্যাগুরুরাই বাস করতে পারব, মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় অন্য ধর্মের কোনো স্থান নেই। ‘আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে’ এই মনোভাব এখন শুধু কল্পনায়ই সম্ভব। এদেশে আমাদের মনোভাব হলো আমি একাই রাজা হবো, কাউকে থাকতে দেব না! অপ্রয়োজনীয় অনুভূতি বেশি থাকলে যা হয় আরকি!

আচ্ছা, একটা কথা ভেবে বলুন তো, যদি এখানে কোনো পূজা-পার্বন উপলক্ষ্যে হিন্দু দেবী বা প্রতিমার ছবি সত্যিই থাকতো, তাহলে কি কোনো ক্ষতি হতো? কেন এখন কি রমজান মাসকে কেন্দ্র করে শত শত বিজ্ঞাপন তৈরি হচ্ছে না? ইদ উপলক্ষ্যে কি অসংখ্য নাটক সিনেমা নির্মাণ হচ্ছে না? তবে অন্য ধর্ম নিয়ে হলেই বা কী? কেন আমরা এতটা আত্মকেন্দ্রিক? কেন শুধু নিজেকে ছাড়া আর কাউকে সহ্য করতে পারি না? সৌন্দর্য তো বৈচিত্র্যে – তা কি এদেশের গন্ডমূর্খরা জানে না?

প্রতিটা সময় প্রতিটা বিষয়কে এদেশের কেউ না কেউ ধর্মীয় ইস্যু বানিয়ে ছেড়েছে। এসব নিয়ে কথা বলতে, লিখতে এখন ক্লান্ত লাগে। তবু বলতে হয়। তবু আওয়াজ তুলতে হয়। এত মানুষ প্রতিবাদ করার পরেও যেখানে সহিংসতা বন্ধ হচ্ছে না সেখানে থেমে গেলে কী অবস্থা হবে ভাবাই যায় না!

আমরা আসল বাংলাদেশটা চিনি না। আসল বাংলাদেশটা তো চেনে সেই শিশুটা যে নিজের ধর্মীয় উৎসব প্রাণ খুলে আনন্দ করতে পারে না। সত্যিকার বাংলাদেশটা তো চেনে সেই পাহাড়ি শিশু যে নির্বিচারে নিজের আপনজনকে খুন হতে দেখে, বাড়িঘর জ্বলে যেতে দেখে। সত্যিকারের বাংলাদেশটা চেনে সেই মানুষটা যে ক্ষুধার জন্য প্রাণ দেয়। আমরা তো বাস করি একটা খোলসের মধ্যে, সত্যিকারের বাংলাদেশটা আমরা চিনবো কী করে?

জাফর ইকবাল স্যার তার একটা লেখায় লিখেছিলেন, যদি আদিবাসী প্রত্যন্ত অঞ্চলের আদিবাসী একটা শিশু হাসিমুখে বলে যে দেশটা ঠিকঠাক চলছে, তবে ধরে নিতে হবে দেশটা ভালো আছে। আর যদি শিশুটা মন খারাপ করে বলে যে দেশটা ভালোভাবে চলছে না, তবে ধরে নিতে হবে দেশটা সত্যিই ঠিকঠাক নেই। কারণ ওরাই আসল বাংলাদেশটাকে চেনে।

কোনো আদিবাসী শিশু বলবে দেশটা ভালো চলছে? আমার তো মনে হয় না! যেখানে সামান্য একটা শব্দ আমাদের সহ্য হয় না, সেখানে আস্ত মানুষজনের কী অবস্থা হয় তা না বলাই ভালো। ওদেরকে সারাজীবন আমরা কাঁদিয়েই যাব। তারপর গর্ব করে নিজেকে মুসলিম পরিচয় দেব! হ্যাঁ, এটাই আমাদের প্রথম এবং একমাত্র পরিচয়! এটা ছাড়া গতি নেই।

উগ্র ধর্মান্ধ হতে গিয়ে আমরা আবার মন্যুষত্ব হারিয়ে ফেলছি না তো? পশুর কিন্তু আবার কোনো ধর্ম নেই!

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।