শিরোনাম
প্রচ্ছদ » আমাদের সাহিত্য » বই পরিচয় » প্রজেক্ট প্রজেক্টাইল : ধর্ম ও বিজ্ঞানের অপূর্ব মেলবন্ধনের গল্প

প্রজেক্ট প্রজেক্টাইল : ধর্ম ও বিজ্ঞানের অপূর্ব মেলবন্ধনের গল্প

প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৮৭:৫৫:০২ অপরাহ্ন

মোঃ আশিকুর রহমান খান
ধর্ম ও বিজ্ঞান– এ দুয়ের দ্বন্দ্বের ইতিহাস বহু পুরনো। ঠিক কবে থেকে এ দুইয়ের দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল, সে ব্যাপারে বিস্তারিত কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র আজও পাওয়া যায়নি। যুক্তিনির্ভর বিজ্ঞান ও বিশ্বাসনির্ভর ধর্মের মাঝে চলমান দ্বন্দ্বে জড়িয়ে কতজন যে হতাহত হয়েছে, সে ব্যাপারেও কোনো পরিসংখ্যানিক উপাত্ত পাওয়া যায়না। ধর্মীয় অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলো ধর্মে বিশ্বাস করতে বলা হলেও আধুনিক বিজ্ঞানের কোনো তত্ত্ব দিয়ে সরাসরি তাকে প্রমাণ করা যায়না। এ নিয়েই ধর্মবাদী ও বস্তুবাদীদের যত দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে।এমনই এক দ্বন্দ্বের গল্প নিয়ে পাঠক সমাজে হাজির হয়েছেন তরুণ লেখক মোহাম্মদ সাইফূল ইসলাম। ১৯৮১ সালে জন্ম নেওয়া এ লেখকের বাবার চাকরির সুবাদে শৈশব কাটে দেশে-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায়। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়(কুয়েট) থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি(সিএসই) বিষয়ে স্নাতক(সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশাগত জীবনে উদ্যোক্তা হিসেবে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সে প্রতিষ্ঠানের সুবাদে বর্তমানে লিবিয়ায় প্রবাস জীবন যাপন করছেন তরুণ এ লেখক। তো, যা বলছিলাম তখন! ধর্ম ও বিজ্ঞানের এ বিরোধের গল্পের আশ্রয়ে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী তুলে ধরেছেন এ লেখক। মহাবিশ্বের জন্ম ও গঠন নিয়ে মানুষের জল্পনা-কল্পনার কোনো শেষ নেই। বারবার মানুষ চেষ্টা করেছে মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটন করতে। বার বার মানুষ মহাকাশে ছুটে গিয়েছে এ রহস্যের টানে। বার বার ব্যর্থ হলেও মানুষের এ উৎসাহে কোথাও যেন কোনো ভাটা পড়েনি কখনোই। বরং একেক বার ব্যর্থ হবার পর পরের বার দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে ছুটে গিয়েছে মহাবিশ্বের পানে। মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটন করতে আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা সংস্থার এক প্রজেক্টের গল্প নিয়ে রচিত বইয়ের নাম “প্রজেক্ট প্রজেক্টাইল”। পাশাপাশি মানুষের মানবিকতার নানা দিক সংক্রান্ত আলোচনা এ বইটিতে সমানভাবে স্থান পেয়েছে। একদিকে বিজ্ঞান, অন্যদিকে মানবিকতা— এ দুইয়ের অসম লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কোন শক্তির জয় হয়? বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত দানবীয় শক্তির জয় হয়, নাকি “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই”—- চণ্ডীদাসের এ জনপ্রিয় উক্তির সত্যতা আরেকবার প্রমাণিত হয়? এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে উল্লেখিত বইয়ের পাতায়।
.
আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার পক্ষ থেকে মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটনে এক প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়। প্রজেক্টের নাম “প্রজেক্ট প্রজেক্টাইল”। টাইম ও স্পেসের মাত্রা শূন্য হলে সেখানে কী ঘটতে পারে, তা খুঁজে বের করাই এ প্রজেক্টের উদ্দেশ্য। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মহাকাশে স্পেসশিপ পাঠানো হয়। মহাকাশচারী হিসেবে এ অভিযানে অংশ নেন পৃথিবীর সকল বাঘা বাঘা পদার্থবিদ, গণিতবিদ ও বিজ্ঞানীরা। এদের সাথে এ অভিযানে যাবার সুযোগ পান বাংলাদেশের এক অখ্যাত যুবক। তার নাম প্রবাল। পেশায় বংশীবাদক প্রবাল কী করে এ অভিযানের সওয়ারী হলেন, তা নিয়েই এ বইয়ের গল্প। শুনতে বেশ অবাক লাগলেও এ বংশীবাদক অন্যান্যদের সাথে মহাকাশে পাড়ি জমান। পরবর্তীতে ঘটনাচক্রে যখন তাদের ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা নেমে আসে, তখন এ অখ্যাত বংশীবাদকের প্রচেষ্টায় তারা সকলে বিপদ থেকে মুক্ত হন। কিন্তু একজন সামান্য বংশীবাদক কী করে রক্ষা করতে পারে এ মহাকাশযানকে। প্রিয় পাঠক! সে প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে চোখ রাখতে হবে উপন্যাসের পাতায়। এ তো উপন্যাসের একদিকের গল্প। এর পাশাপাশি দুই নরনারীর অতৃপ্ত প্রেমের গল্প-ও সমানভাবে ফুটে উঠেছে এ উপন্যাসটিতে। প্রেম এ উপন্যাসের মুখ্য কাহিনী না হলেও তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নির্ভর এ উপন্যাসটাতে।উক্ত উপন্যাসের আলোচ্য বিষয়বস্তু নিয়ে কথা তো কম হলো না। এবার আসি চরিত্রগত বিশ্লেষণের অংশে। আমার মতে, এটাকে ঠিক বিশ্লেষণ না বলে ব্যবচ্ছেদ বলাই বোধ হয় অধিকতর শ্রেয় হবে। কেননা, রিভিউয়ের এ অংশে লেখকের সৃষ্টিকর্মকে ইচ্ছেমত টেনে-হিঁচড়ে, কেটে কুটিকুটি করা হয়। যা হোক, মূল আলোচনায় ফিরে আসা যাক আবার। উপন্যাসের মুখ্য চরিত্রে রাখা হয়েছে প্রবাল নামক এক বংশীবাদককে। মহাবিশ্বের রহস্য সংক্রান্ত জটিল বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে পূর্বদেশীয় একজন সামান্য বংশীবাদকের ভূমিকা কী হতে পারে, সেটাও এক অপার বিস্ময়। তার চাইতে বড় বিস্ময় হচ্ছে, এ নগণ্য ব্যক্তির ভূমিকাতেই আসন্ন বিপদের হাত থেকে রক্ষা পায় প্রথিতযশা বিজ্ঞানীর দল। কিন্তু এটাও কি কখনো সম্ভবপর হতে পারে? হ্যাঁ, পাঠক! এটাও সম্ভবপর হয়ে উঠতে পারে, যার সত্যতা পাওয়া যাবে উক্ত বইয়ে। এর পাশাপাশি তার জীবনের এক অতৃপ্ত দিক বেশ সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলবার কাজটি সুনিপুণ হাতে করেছেন এ ঔপন্যাসিক। বিজ্ঞানের ডাকে সাড়া দিয়ে নিজের ব্যক্তিগত জীবনে অনেক কিছুই হারাতে হয় তাকে। যাকে নিজের নিত্যসঙ্গিনী করার কথা ভেবেছিল, সে তার জীবনে বাস্তব হয়ে ধরা দেয় না আর। অধরাই রয়ে যায় তার বহুদিনের লালিত সে স্বপ্ন। সবকিছু হারিয়েও সে যেন আজ জয়ী। এভাবেই এগিয়ে যায় উপন্যাসের কাহিনী।

উপরোল্লিখিত চরিত্রের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র রয়েছে। সে চরিত্রের নাম বন্দনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক দিলীপ চৌধুরীর একমাত্র সন্তান বন্দনা চৌধুরী। মা-মরা মেয়ে বন্দনার সময় একান্ত নিরবে-নিভৃতে। বাবা তার চাকরি ও কর্মব্যস্ততার কারণে মেয়েকে সময় দিতে পারেন না। এ নিঃসঙ্গতা কাটাতে বন্দনা একসময় শিল্পকলা একাডেমিতে ভর্তি হয়। এ ভর্তির সুবাদে প্রবালের সাথে তার পরিচয় হয়। প্রবালের ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে তাকে ঘিরে বিনা সুতোয় আগামী দিনের স্বপ্নজাল বুনতে শুরু করে দেয় বন্দনা। এক পর্যায়ে নিজের ভাবাবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে নিজের মনের কথা বলে দেয় প্রবালকে। কিন্তু প্রবাল এটাকে নিতান্ত ছেলেমানুষি জ্ঞান করে অবজ্ঞা করতে শুরু করলে ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয়। প্রবালকে নিজের করে পাবার তীব্র বাসনা তার এ স্বপ্ন পূরণের সহায়ক না হয়ে বরং কাল হয়ে দাঁড়ায়। সুদীর্ঘকাল অপেক্ষার পরেও নিজের প্রিয় মানুষ তার আপনজন হয়ে ওঠে না আর! বিজ্ঞান তাকে বেগ দিলেও কেড়ে নেয় আবেগ। এগিয়ে চলে উপন্যাসের গল্প।

উপরোক্ত দুইটি মুখ্য চরিত্র ছাড়াও উপন্যাসে আরো কিছু গৌণ চরিত্রের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু চরিত্র হচ্ছে, ক্যাসিও আন্তের, দিলীপ চৌধুরী, স্বর্ণা, মিলিতা, বিশিষ্ট গণিতবিদ টয়লার, জগদ্বিখ্যাত পদার্থবিদ ভ্লাদিমির, ক্যাপ্টেন চমনোস্কি, ফাদার প্রমুখ। এসবের চরিত্রের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন চরিত্র লাইকাকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যায় এ গল্পে। প্রত্যেকে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী/অধিকারিণী হবার ফলে এ উপন্যাসে এক আলাদা মাত্রা যুক্ত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, টয়লার ও ভ্লাদিমিরের নিত্যকার ঝগড়া উপন্যাসের গল্পে আলাদা এক ব্যঞ্জনা দান করেছে। তেমনি, পেশাগত জীবনে চিকিৎসক মিলিতার হাসি-খুশি ও মিশুক স্বভাব তাকে অন্যান্য চরিত্র থেকে সহজেই আলাদা করে তুলেছে পাঠকের চোখে। এসব গৌণ চরিত্রের আলাদা আলাদা ভূমিকা গল্পের প্রয়োজনেই যুক্ত করা হয়েছে। উপন্যাসের পুরো কাহিনী একটা বৈজ্ঞানিক প্রজেক্টকে ঘিরে এগিয়েছে বিধায় উক্ত প্রজেক্টের নামে নামকরণ করা হয়েছে উপন্যাসের। তবে সবকিছু ছাপিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে প্রবাল ও বন্দনার গল্প।

এবার আসি উক্ত বইটির ভাষার গল্পে। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী হলেও ভাষার ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা চোখে পড়েনি আমার। বেশ সহজ ভাষায় ঔপন্যাসিক এ উপন্যাসের গল্প লিখে গিয়েছেন। গল্পের স্বার্থে কোথাও কোথাও বৈজ্ঞানিক টার্ম ব্যবহৃত হবার ফলে শুরুতে কিছুটা জটিল লাগছিল এগুলো। তবে আশার কথা হলো— উপন্যাসের শেষে প্রয়োজনীয় টিকা সংযুক্ত থাকার ফলে এগুলো বুঝতে তেমন কষ্ট হয়নি আমার কোনো। এছাড়া বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর পাশাপাশি নরনারীর চিরকালীন প্রেমের দিকটি আলাদা মাত্রা যুক্ত করেছে এ বইটিতে। এ দিকটি যুক্ত হবার ফলে এটি অন্যান্য আর দশটি সাধারণ বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর তুলনায় ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ও অতৃপ্ত প্রেমের গল্প— এ দুইয়ের মধ্যে এক অপূর্ব সমন্বয় সাধিত হবার ফলে বইটি আলাদা এক আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে।
.
সর্বোপরি, এক কথায় বলতে গেলে, উপন্যাসের গল্প, দ্বৈত বিষয়বস্তুর সমন্বয় ও ভাষাশৈলী— এসব কিছুর বিচারে বইটি দারুণ সুখপাঠ্য এ উপন্যাস বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। যারা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী পড়তে ভালোবাসেন, তাদের মনে এ উপন্যাস একটু হলেও আলাদা জায়গা করে নিতে সক্ষম হবে, এটাই আমার বিশ্বাস। আশা করি, কোনো পাঠক বইটি পড়ে আশাহত হবেন না।

উক্ত বই সম্পর্কিত আরো কিছু ব্যাপারে না বললেই নয়। প্রথমত উল্লেখ্য যে, এ বইটি যে প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে, সে প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত প্রথম বই এটি। প্রথম বই হিসেবে কাগজের কোয়ালিটি, বাইন্ডিং থেকে শুরু করে লেখার মান—-কোথাও কোনো ব্যাপারে কিছুর কমতি দেখিনি এ বইতে। বিশেষত কোথাও কোনো ভুল-ত্রুটি দেখলে তা তাদের অফিশিয়াল মেইলে জানানোর আহ্বান ও বড় ধরনের কোনো সমস্যা থাকলে রিফান্ডিংয়ের বিষয়টা সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে আমার কাছে। উপরন্তু, একটা সুদৃশ্য বুকমার্ক বইয়ের সাথে দেওয়া হয়েছে উপহারস্বরূপ, যা একজন পাঠকের আনন্দ বহুগুণে বাড়িয়ে দিতে যথেষ্ট। প্রসঙ্গত আরো উল্লেখ্য যে, ইদানীং সময়ে আমাদের দেশের প্রকাশনী প্রতিষ্ঠানগুলো নবীন লেখকদের লেখা প্রকাশের সুযোগ খুব কম দেয়। সে তুলনায় এ প্রকাশনীর এমন উদ্যোগ এ দেশীয় সাহিত্য অঙ্গনের জন্যে সত্যিকার অর্থেই আশাজাগানিয়া। এমন মহৎ উদ্যোগ আরো অব্যাহত থাকুক। তাদের সরব পদচারণায় মুখরিত হোক বাংলা সাহিত্যের সকল অঙ্গন।

আসুন, সকলে সুস্থধারার বই পড়ি। আর সম্ভব হলে, বই কিনে পড়ি। নিতান্তই সত্যিকারের দরকার না হলে ফ্রি পিডিএফকে না বলি!

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।