প্রচ্ছদ » আমাদের সাহিত্য » একজন খুনি কিংবা চন্দ্রগ্রস্তঃ তরুণী কবির আশা জাগানিয়া যাত্রাশুরু!

একজন খুনি কিংবা চন্দ্রগ্রস্তঃ তরুণী কবির আশা জাগানিয়া যাত্রাশুরু!

প্রকাশ : ২০ জুন ২০১৮৬:০১:৫৪ অপরাহ্ন

খাতুনে জান্নাত | বাংলা ইনিশিয়েটর


বই বিমুখ এই বাংলাদেশে বই পড়ুয়া তরুণ-তরুণী কিন্তু খুব একটা বেশি নেই। তার উপর যারা বই পড়ে, তাদের মধ্যেও গড়ে উঠছে উপন্যাস নির্ভর একদল পাঠক, যারা ছোটগল্প কিংবা কবিতা ছুঁয়ে দেখতেও নারাজ! অথচ আমাদের আছে সকল বিষয়ে সমৃদ্ধ এক সাহিত্য। সেই সাহিত্যের স্বাদ যদি আমরাই আস্বাদন করতে না পারলাম, তবে আমাদের মতো দূর্ভাগা আর কে আছে?

বাংলা একাডেমীর দেয়া তথ্যানুযায়ী, এবার বইমেলায় বিক্রি হয়েছে প্রায় ৭০ কোটি ৫০ লক্ষ টাকার বই। যা গতবছরের তুলনায় ৫ কোটি টাকা বেশি। কিন্তু জানি না এ বই পড়া, বই কেনা বইমেলাকেন্দ্রিকই কিনা শুধু। কারণ সব পরিসংখ্যান অনুযায়ীই এদেশে বইপড়ুয়া মানুষ কম।

এমন অবস্থায় যদি দেখি তরুণ ছেলে-মেয়ে শুধু বই পড়া নয়, চমৎকার কিছু লেখাও তাদের হাত দিয়ে বেরোচ্ছে, তবে নিঃসন্দেহে আনন্দ লাগে। তেমনই একটা বই ‘একজন খুনি কিংবা চন্দ্রগ্রস্ত’। তরুণী লেখিকার প্রথম একক কবিতার বই হলেও বইটির প্রতিটি কবিতাই স্পর্শ করবে পাঠকের হৃদয়।

“ঠিক যেভাবে
তোমাকে ভালোবাসি না বলে
ভালোবাসব না বাসব না করেও
অসংখ্যবার তোমাকেই ভালোবেসেছিলাম”
(কবিতাঃ তুমি)

কিংবা

“শুধু আমাকে ভালোবাসতে গেলেই তুমি হয়ে যাও ছন্নছাড়া,
আমার কথা আসতেই তুমি তখন ভবঘুরে পথিক,
কেবল তখনই তুমি হয়ে যাও বেপরোয়া, অবাধ্য প্রেমিক…”
(কবিতাঃ সংসারী প্রেমিক)

লাইনগুলো পড়ার পর মনে হয়েছে হয়তোবা এমন কিছুই লিখতে চেয়েছিলাম, কেবল ভাষাটা জানতাম না। কবিতা পড়ে না এমন মানুষও এই বইটির প্রতিটি কবিতা পড়তে বাধ্য হবে। কারণ প্রতিটি লাইনের প্রত্যেকটি শব্দ, বাক্য, ভাষা এতটা সমৃদ্ধ; যে যেকোন মানুষই মুগ্ধভাবে তা পড়বে।

বইয়ের ৩০ টি কবিতার নামগুলোও বেশ চমৎকার। নৈঃশব্দ্যের বিষাদমালা, ইচ্ছামৃত্যু, ফিনিক্স কিংবা মেঘদল – এই ধরণের নামগুলোও বেশ আগ্রহ জাগানিয়া। নাম দেয়ার ক্ষেত্রেও লেখিকার প্রশংসা করতেই হয়।

কয়েকটা কবিতার কিছু লাইন দিচ্ছি –

“বহুকাল কথা বলেছি আমরা, নিঃশব্দে।
বহু না বলা কথা বলেছি দুজনে, আমরা কেউ কারো না অথচ যেন,
আমরা দুজন দুজনের জন্যই সৃষ্টি!”
(বর্ষাবিকেল এবং তুমি)

“এইসব অপেক্ষারাও আহত হতে হতে ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়ছে,
আমার শরীরে অবশতা নেমে এল এই বুঝি,
যেন গোধূলির আরক্তিম যৌবনরবি অন্ধকারে সঁপে দেয়ার মত।
আর কত বোশেখ কেটে গেলে চিলেকোঠা থেকে মুক্তি পাবে আমি ও আমার অপেক্ষারা?
কতটা পথ কৃষ্ণচূড়ার গা মাড়িয়ে হেঁটে আসবে তুমি যে, এত দেরী হচ্ছে?
আচ্ছা, আমার এই স্বেচ্ছা নির্বাসনের কতটা যুগ পেরুলে তুমি এসে দাঁড়াবে
আমার চিলেকোঠার জানলায়?”
(বর্ষাবিকেল এবং তুমি ২)

“কতটা অপরিচিত হলে এক জন্মে বারবার আমার
তোমার কথাই মনে পড়ে?
কতটা অপরিচিত হলে আমার সব গল্পে তুমিই থাকো?
আচ্ছা, আর কতটা অপরিচিত হলে পরে এই এতটা দূরত্ব ঘুচবে? বলতে পারো তুমি?”
(অপরিচিত)

“আমি তোমাকে কি করে ভুলি বল?
আমার চোখে চোখ পেতে তোমার চোখ নাহয় মিথ্যে বলেছিল।
কিন্তু আমি যে ও চোখে তখনই ডুবেছিলাম।”
(দেবী)

“আমাদের প্রতিদিন কথা না হোক
দেখা হোক অন্তত কয়েকশোবার
হাতে হাত না পড়ুক
অন্তত চোখাচোখি তো হোক!
পাশাপাশি হাঁটতে না পারি
মুখোমুখি আচমকা দেখা হোক।”
(চেনা-অচেনা)

“কবি, কবি!
ও কবি?
আমি যেমন করে তোমার প্রেমে পড়ি,
তুমিও এমন আমার প্রেমে পড়ো না গো, দেখি!”
(কবি, এই কবিতা তোমার জন্য)

কবিতাগুলোতে যেন প্রাণ আছে, যে প্রাণ আপনাতেই সঞ্চার হয় পাঠকের মাঝে। সহজে বোধগম্য কবিতা, অথচ সমৃদ্ধ শব্দশৈলির কারণে বইটি আমার বেশ ভালো লেগেছে। তরুণ বয়সেই এ ধরণের লেখা যে লিখতে পারে, তার প্রশংসা করতেই হয়!

  • বইঃ একজন খুনি কিংবা চন্দ্রগ্রস্ত
  • লেখকঃ আফরিন নাহার
  • ধরণঃ কবিতা
  • মূল্যঃ ১৩৫ টাকা
  • পৃষ্ঠাঃ ৪৮
  • প্রথম প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
  • কবিতা সংখ্যাঃ ৩০
  • ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৭.৫
বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।