প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » “শিক্ষা না সফলতা? “

“শিক্ষা না সফলতা? “

প্রকাশ : ২০ জুন ২০১৮১১:১৫:০৯ অপরাহ্ন

ফাইজা ফারিহা ইমাম | বাংলা ইনিশিয়েটর

আমাদের সবারই “সফল” হওয়ার পিছনে কেমন যেন একটা উৎসাহ বা প্রতিযোগিতা থাকে। খুব ছোট থাকতেই আমাদের বলা হয় “লেখাপড়া করে যে গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে”। ক্লাসে কে প্রথম হচ্ছে তার দিকে খেয়াল দেয়া, তার সাথে নিজেদের বাচ্চাদের চলতে বলা আর যে কত প্রক্রিয়া! সারাবছর খবর না নেয়া মানুষগুলোর যেন রেজাল্টের দিনই হালচালের কথা মনে পরে। এমনি একই পরিবারের সমবয়সী ভাই-বোনদের মধ্যেও প্রতিযোগিতা হয়। যে যত প্রাইভেট বা ক্লাস করে সে তত খাটছে, তার জ্ঞানের পরিধি বাকিদের থেকে বেশি বলে ধরে নেয়া হয়। কিন্তু আমরা কখনো কি ভাবি যে আসলেই আমাদের জ্ঞান-ধারনা কতটা মজবুত? আমরা কখনো কি ভেবেছি যে আমরা আসলে কিসের জন্য এতো দৌড়াদৌড়ি করছি? আমরা আসলেও আমাদের শিক্ষাকে কাজে লাগাতে পারছি কিনা?

পুরা বই মাথায় রেখে, সবকিছু দিয়ে পরিক্ষা শেষে দিনরাত প্রার্থনা করা যেন ‘জিপিএ ৫’ না মিস হয়ে যায় বা অমুক ছেলের থেকে যেন কম না পায়। কেউ সৎভাবে বা কেউ অসৎ ভাবে পরীক্ষা দিলেও প্রার্থনা থাকে একই। জিপিএ ৫ পেয়েছো তাহলে তুমি খুব ভালো জ্ঞান রাখো, খুব ভালো রেজাল্ট করেছো। আর না পেলে? আরে কি হবে তোমার জীবন শেষ, সব শেষ। চাকরি পাবে না, কেউ বিয়ে করবে না, মানুষ খারাপ বলবে, কেন বাবা-মা এতো টাকা উড়ালো। সবশেষে কি হবে? ফ্যানের সাথে ঝুলে যেতে হবে; কারণ মানুষকে দেখানোর মতোন মুখ আর তোমার নেই, আর বাবা-মার সম্মান তো ডুবিয়ে দিয়েছই।

এরই এক উদাহরণ সানজিদা ইসলাম নোভা, তার ক্লাসের ‘ফার্স্ট গার্ল’, যে নিজের গলায় ফাঁসি দেয় শুধুমাত্র তার এসএসসিতে ৪.৭৩ পাওয়ার কারণে। এরকম অনেক তরুণদের খবর প্রতিবছর আমরা নিউজপেপার, টেলিভিশনে দেখি আর কয়েকদিন পরে তা তাদের “প্রাপ্য ফল” ভেবে ভুলে যাই।

আসলেই কি আমরা শিক্ষিত? তাহলে আমরা কেন বুঝি না যে একটা কাগজ কারো ভবিষ্যৎ নির্ণয় করে দিতে পারে না? একটা কাগজকে আমরা এত ক্ষমতা কেন দিলাম যার কারণে প্রতিবছর দেশে লক্ষ লক্ষ প্রাণ অকালে ঝরে পড়ছে?

দেশের উন্নয়নে কেন আমরা এখনো পিছিয়ে আছি? কেন আমাদের মাঝে এখনো নারী-পুরুষ সমতা নিয়ে প্রশ্ন আছে? কেন আজও আইন আমাদের কাছে ব্যবসা লাগছে? কেন “ভিক্ষুকমুক্ত” এলাকার সাইনবোর্ড থাকলে সেখানেও ভিক্ষুককে দেখা যাচ্ছে আর আশেপাশের মানুষ দেখেও না দেখার মতোন আচরণ করছে? যাদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়া উচিত তারা মাত্র ১৫-১৬ বয়সে বিভিন্ন অনৈতক কাজে হাত দিচ্ছেই বা কেন? আর পরীক্ষা আসলে আগের রাতে প্রশ্ন পেয়ে যাবে বলে বাবা-মার লাখলাখ টাকা ভাসিয়ে দিচ্ছি কেন? ডাক্তারি ঠিকভাবে না পড়ে ঘুষ দিয়ে চিকিৎসাক্ষেত্রে গিয়ে তাহলে কেন ভুল চিকিৎসা করছে কেউ কেউ? কারণ শিক্ষা নেই বরং সফলতার পিছনে পাগলের মতো ছোটার এক ধোকা বা লোভ ভরা মানুষ এখন এদেশের মাঝে। নেলসন ম্যান্ডেলা একটি কথা সবসময় বলতেন “Education is the most powerful weapon which you can use to change the world”.

আসলে আমাদের ছোট থেকে সফলতার পিছনে দৌড়াতে মানা করে বলা উচিৎ শিক্ষার পিছনে দৌড়াতে। সফলতা শিক্ষা ছাড়া আসবে না। আর শিক্ষা শুধুমাত্র বইয়ের পাতায় লিপিবদ্ধ না, শিক্ষা সব কিছু থেকে পাওয়া যায়। সব মানুষ থেকে শিক্ষা নেয়ার আছে, পরিবেশ থেকে শিক্ষা নেয়ার আছে। সফল হতে চায় না এমন মানুষ পাওয়া খুব কষ্টের কিন্তু প্রকৃত পক্ষে শিক্ষা পেতে চায় এমন মানুষ খুব কম দেখতে পাওয়া যায়। সফল হতে চাওয়া আসলেই কোনো খারাপ কিছু না। তবে যদি শিক্ষার পিছনে মানুষ ঘুরঘুর করতে তাহলে মনে হয় একপ্রকার আলাদা সমাজ দেখা যেত যেখানে সবাই সুবুদ্ধি নিয়ে কাজ করে, উন্নতি চায়। পরিবর্তনের জন্যে আফসোস করে বসে থাকতো না বরং নিজ থেকে কাজও করতো। শিক্ষার পিছনে মানুষ বেশি চিন্তা করলে নেতৃত্ব দেয়ার থেকে নিজেকে কাজে লাগানোর প্রতি মনোযোগী হতো। রাস্তাঘাটের ছবি বদলিয়ে যেত। অনিয়ম কম হতো। তরুণরা নিজেদের জীবন দেয়ার কথা ভাবতো না। দেশ সুন্দর আর উন্নত হতো। পৃথিবী বসবাস করার জন্যে আরো সুন্দর জায়গা হতো। প্রতিযোগিতা বা অন্যকে ছোট করার বাদ দিয়ে নিজের মাঝে ভুল গুলা বের করা শিখতে হবে। শিক্ষা আর প্রকৃত শিক্ষা ভিন্ন।

তাই আমাদের মন থেকে উচিৎ সত্যিকারের মানুষ হওয়ার জন্যে শিক্ষাকে সবার আগে দেখা, সেই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়েই নিজের ব্যক্তি জীবনের সাথে চারপাশের পরিবেশকেও সেভাবে গড়ে তোলা। দেখবে এমনিতেই সফলতা হাতের মুঠোয়।

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।