প্রচ্ছদ » উড়াল » যদি থাকে অদম্য ইচ্ছা, তবে তুমিও পারবে!

যদি থাকে অদম্য ইচ্ছা, তবে তুমিও পারবে!

প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৮১:০৬:১৫ অপরাহ্ন

রায়হান আহমেদ | বাংলা ইনিশিয়েটর

ভিকারুন্নেসা হ্যান্ডবল টিম

প্রত্যেক মানুষের কিছু না কিছু নিয়ে স্বপ্ন থাকে। সেই স্বপ্ন নিজেকে নিয়ে, নিজের দেশকে নিয়ে, নিজের পরিবারকে নিয়ে, নিজের ইচ্ছাকে দুনিয়ার সবার দৃষ্টিগোচর করা নিয়ে। কথায় আছে হাতের ৫টি আঙুল যেমন ভিন্ন হয় মানুষও তেমনি ভিন্ন হয়। মানুষ যেমন ভিন্ন তেমনি তাদের স্বপ্নও ভিন্ন ভিন্ন রকমের। জীবনের প্রত্যেক ধাপই যেন একপ্রকার সুযোগ নিজেকে সবার সামনে তুলে ধরার আর স্বপ্নের সিঁড়ি পাড় করার। সেই ধাপ গুলার প্রথমটি হলো স্কুল কিংবা বলা যায় স্কুল জীবন!

স্কুল জীবনের ১০ বছরে আমাদের চিন্তা-ধারার ভিত তৈরি করে, একপ্রকার পরিবর্তন নিয়ে আসে আমাদের মধ্যে যার কারণে আমাদের বাকী জীবনের ভিত আরো মজবুত হয়। জীবন কে আলাদা ভাবে দেখা হয় এই ১০ বছরে। কেউ নিজের স্বপ্ন নিয়ে আরো বেশি সচেতন হয়, কেউ স্কুল থেকে পাওয়া উদ্যোগগুলো কাজে লাগিয়ে নিজেকে শক্ত করে- আত্মবিশ্বাসী বানিয়ে নেয়। এই স্কুল জীবন থেকে ভবিষ্যৎ এর সেরা লেখক পাওয়া যায়, ভালো ডাক্তার পাওয়া যায়, বিশাল সেতু নির্মানকারী ইঞ্জিনিয়ার পাওয়া যায়, সেরা ক্রিকেটার পাওয়া যায় আর হাজার হাজার সু-নাগরিকও পাওয়া যায় এই স্কুলের ১০ বছরের শিক্ষা থেকে। প্রত্যেক স্কুল যেন শিক্ষা দেয় নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার, সুযোগ দেয় নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলার। সুযোগগুলো থেকেই যেন জীবন এর কতো কিছু শিখে নেয়া যায়! যেমন খেলাধুলার সুযোগ।

প্রত্যেক স্কুলের বিভিন্ন খেলাধুলার সুযোগ থাকে।তেমনি আমাদের স্কুলেও খেলাধুলার সুযোগ আছে।আমাদের স্কুল এর নাম ভিকারুন্নিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রতিবছর আমাদের স্কুল থেকে শত শত মেয়েরা বের হয় যারা পরে দেশের সু-নাগরিক হওয়ার সাথে সাথে নিজেদের জীবনে সার্থক হয়ে দেখায়। আমাদের স্কুলে যেমন নিয়ম-কানুন নিয়ে আমাদের সর্বদা সচেতন রাখে, তেমনি পড়াশুনার সাথে খেলাধুলা নিয়ে আমাদের বিভিন্ন সুযোগ দেয়। তার মধ্যে হ্যান্ডবল খেলাটি সবার মধ্যে একটি অন্যতম জায়গা করে নিয়েছে।

পত্রিকার পাতায় আমাদের গল্প!

প্রথমে এতো বেশি প্রভাব না ফেলতে পারলেও এখন বহু মেয়েরা আমাদের স্কুল এর এই টিমকে দেখে নিজেকে আরো বেশি মজবুত করে নিচ্ছে, পাশাপাশি যে সকল মানুষেরা “আরে মেয়ে জাত কিসের খেলাধুলা?” বলে হাসতো তাদের মুখে প্রমাণ সহ জবাব দিয়ে দিয়েছে। অধিক পরিশ্রম, অধিক চেষ্টার কারণে আমাদের স্কুলের হ্যান্ডবল টিমের মেয়েরা তা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে মেয়েরা খেলাধুলা করতে পারে, মেয়েরা সকল কিছুই করে দেখাতে পারে।

একসময় ছিল যখন হ্যান্ডবল খেলাটা মেয়েদের কাছে এতোটা জনপ্রিয় ছিলো না। কিংবা কারো কারো ইচ্ছা থাকলেও সুযোগ ছিল না! আমাদের স্কুলের কিছু মেয়ের প্রবল ইচ্ছায় আমাদের প্রিয় লিপি আপা সিদ্ধান্ত নেয় স্কুল এ সপ্তাহে একদিন ছুটির পর খেলার। আপা প্রথমে নিজেও বুঝতে পারেন নি যে এতো মেয়ে তার বলাতে আসবে, তিনি আসলে আশা করেননি যে এতো মেয়েদের মাঝে নিজেকে আলাদা করে তোলার স্বপ্ন আছে, আছে ভিন্ন রকম ইচ্ছা। লিপি আপা আমাদের হেড-মিস্ট্রেস আপাকে এ নিয়ে বললেন। লিপি আপার পিছনে সেসব মেয়েরা দাড়িয়ে শুধু আপার একটা “হ্যাঁ” – এর অপেক্ষা করছিল। হেড মিস রাজি হলেন তবে শর্ত দিলেন যেন এই উদ্যোগ অব্যহত থাকে আর এ টিম যেন আরও আগে যায়। মাঠে প্র্যাকটিসের সময় শুরু হলো সকলের আসল পরীক্ষা। কেউ কেউ এসে বলতো, “মেয়ে মানুষ হয়ে শর্টস পরে খেলতে লজ্জা করে না?” আবার কেউ কেউ বলতো, “এ স্কুলে দেখি পরে যতসব জাহান্নামি বানাচ্ছে”, “মেয়ে হয়ে আবার কিসের ছেলেদের সাথে খেলা?”, “হেন্ডবল মেয়েদের জিনিস না”।

এ কথাগুলোকে সকলে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলো। হতাশ হয়ে পিছপা হয় নি। মনেবল বাড়িয়ে নিজেকে প্রমাণ করার লড়াই শুরু করলো মেয়েগুলো। কিছু কিছু মেয়ে যারা হ্যান্ডবলটাকে নিজেদের জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে নিয়ে নিয়েছিল তারা যেন এই কথাকে জীবনের অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ ভেবে নেয়। তারা পেরেছেও; অধিক পরিশ্রম, প্রবল ইচ্ছাশক্তির কারনে তাদের টিম দেশ সহ দেশের বাহিরে বিভিন্ন স্কুল এর সাথে খেলে নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছে যে হ্যান্ডবল খেলাটা ছেলে-মেয়ে সবাই খেলতে পারে।

আমাদের হ্যান্ডবল টিমের সবচেয়ে বেস্ট প্লেয়ার বলা হয় ফাতেমা টিনিকে। যে তার অধিক নিষ্ঠা ও চেষ্টায় সে বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় টিমে খেলার সুযোগ পেয়েছে। পাশাপাশি দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন পর্যায়ে হ্যান্ডবল খেলায় অংশগ্রহণ করছে। শুধু খেলাধুলায় নয় সে পড়াশোনায়ও বেশ ভালো। সে তার পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাকে নিয়ে অনেক সুন্দর করে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার মতোন এরকম আরো অনেকে আছে যারা আমাদের স্কুল কে গর্বিত করছে। ভিকারুননিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজ হ্যান্ডবল খেলার পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে আমাদের লিপি আপা। যিনি মেয়েদেরকে নিজেদের ভেতরের শক্তি প্রমাণ করার জন্য একটি সুন্দর সুযোগ করে দিয়েছেন। তার জন্য আজ মেয়েরা শুধু বাংলাদেশে নয়, বাংলাদেশের বাইরেও খেলাধুলা করতে যাচ্ছে এবং পুরষ্কার অর্জন করছে।

জয়ের পর খেলোয়াড়দের উল্লাস!

একসময় বাবা-মা চাইতো না যে তাদের মেয়েরা খেলাধুলা করুক। বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন কথা বলত।কিন্তু তারা তা উপেক্ষা করে নিজেদের প্রমাণ করেছে এবং সামনে এগিয়ে গিয়েছে। ভবিষ্যতে আরো সামনে এগিয়ে যাবে। দেশের বাইরে যেমন সুইজারল্যান্ড, ভারত, মালোয়শিয়াসহ আরো বিভিন্ন দেশে তারা প্রমাণ করেছে যে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের মেয়েরাও সব দিক দিয়ে এগিয়ে আছে। সাথে আমাদের স্কুলকেও তারা প্রতিনিধিত্ব করেছে, আমাদেরকে করেছে গর্বিত।

কথা ছেলে আর মেয়েদের আলাদা করা নিয়ে না। কথা আমাদের ইচ্ছাকে কাজে লাগানোর। মানুষ চাইলেও পারে। কথায় আছে “Go after your dreams, not people”.

তোমার ইচ্ছাশক্তি অটুট থাকলে দুনিয়ার কোনো শক্তি বা কেউই নেই যে তোমাকে দমাতে পারবে। আর সেই ইচ্ছাকে কাজে লাগাতে পারলেই তুমি সফল মানুষ, হয়ে উঠবে অনুসরণীয়। নিজের মনোবল বাড়াও, স্বপ্ন দেখো আর সেই স্বপ্নের পেছনে ছোটো। বিশ্বাস করো, তুমি পারবে!

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।