প্রচ্ছদ » মুক্তমঞ্চ » জেগে ওঠার সময় এখনই!

জেগে ওঠার সময় এখনই!

প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৮২:২৯:৪৮ অপরাহ্ন

খাতুনে জান্নাত | বাংলা ইনিশিয়েটর


গত ১৬ জুন আমাদের দেশে পালিত হলো ইদ। যখন ঘোষণা হলো যে আগামীকাল ইদ, তখন থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে হইহল্লা, উৎসবের আমেজ। মেয়েরা মেহেদী নিয়ে বসে গেছে হাতে আল্পনা করতে। কেউ কেউ পটকা, বাজি ফাটানোয় ব্যস্ত ছিল। কেউ বা আবার প্রিয়জনদের সঙ্গে ঘুরতে বেড়িয়েছে। নতুন চাঁদকে বরণ করে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন দিনটিতে কী করবে তার পরিকল্পনা করেছে কেউ কেউ। কেউ বা আবার লেগে গিয়েছে রান্নার কাজে। কত্ত অতিথি আসবে বাসায়! আপ্যায়ন করতে হবে যে!

আমাদের দেশের প্রতিটি উৎসবেই সবাই যেন লেগে যায় বাঁধভাঙ্গা উল্লাসে। এ দেশের প্রতিটি মানুষ উৎসব প্রিয়। ‘বারো মাসে তেরো পার্বনের’ দেশে তা যে হবে, এতে আর অবাক হবার কী আছে? আমাদের শুধু একটা উপলক্ষ্য চাই, তারপরই ব্যাস! জীবন দুঃখ-বিষাদ, অফিসের বসের ঝাড়ি কিংবা অন্য কোনো ঝামেলা – সব ভুলে লেগে যাই আনন্দ করতে!

তবে সবার আনন্দ যে শুধুই আনন্দ, তা কিন্তু নয়। কেউ কেউ আছে সুযোগসন্ধানী। এরা চায় সকলের আনন্দে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে। এরা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে কীভাবে ম্লান করে দেয়া যায় প্রতিটি উৎসবকে, কীভাবে ভয় ধরিয়ে দেয়া যায় কারো মনে, কীভাবে হিংস্র ঝাঁপ দেয়া যায় নারী শরীরের ওপর। এমন মানুষ আপনার-আমার সবার আশেপাশেই আছে।

একটা উদাহরণ দিই। ইদের দিন এক ছোটবোন বললো তার বাসায় যেতেই হবে। উপায়ান্তর না দেখে সাধের ঘুমকে বিসর্জন দিয়ে চললাম তার বাসায়। বাসা আমি চিনি না। মেয়েটা আমাকে বললো মনিপুর মূল বালক ভবনের সামনে গিয়ে ফোন দিতে, সে নিয়ে যাবে। আমি তাই করলাম। তবে মেয়েটা ফোন তুলছিলো না। যার কারণে আমার ওই জায়গায় বেশ কিছুক্ষণ থাকার সৌভাগ্য (কিংবা দূর্ভাগ্য) হয়।

ভবনের সামনে প্রায় ৫০-৬০ টা ছেলে হইহল্লা করছিলো। ওখান দিয়ে কোনো মানুষ তো দূরের কথা, কোনো গাড়িও চলাচল করতে পারছিলো না। পুরো রাস্তা ব্লক করে তারা ‘ইদ উদযাপন’ করছিলো! ভালোমতো দেখেই বুঝলাম, এরা কেউ মনিপুরের ছাত্র নয়। কারণ এদের বয়স স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলেদের মতো নয়। তবে এরা এখানে কী করছে? আনন্দের নামে মাতলামো করছে। যার সাথে আমরা অর্থাৎ এ দেশের মানুষেরা দীর্ঘদিন থেকে পরিচিত।

যেকোন উৎসবেই দলবাঁধা কিছু ছেলে-পেলেকে দেখা যাবে রাস্তাঘাটে মাতলামো করছে। তাদেরকে কিছু বলা যাবে না। বলতে গেলেই বাবার বয়সী মানুষের দিকে মারমুখো হয়ে দলবেঁধে তেড়ে আসবে। মেয়েরা সে পথ দিয়ে যেতে পারবে না। ভুলে কোনো মেয়ে চলে গেলেই তো কেল্লাফতে! সেই মেয়েকে অশ্লীল কথা বলে উত্তক্ত্য করা থেকে শুরু করে তার জামা-ওড়না ধরে টানাটানি পর্যন্ত চলে! কেউ প্রতিবাদ করে না, কাছে ঘেঁষতে সাহস পায় না। কারণ সবাই জানে, সম্মিলিত শক্তি বড় শক্তি।

আমাদের স্কুলে গত বছর কনসার্ট হয়েছিলো। তাহসান এসেছিলো সেই কনসার্টে। বাইরের লোকদেরও টিকিট বিক্রি করায় অনেক বাইরের মানুষজনও আসার সুযোগ পেয়েছিলো সেই কনসার্টে। কনসার্টে রক্ত গরম হয়ে উঠবে, তা স্বাভাবিক। তবে জানি না, আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক কেন যেন বলে যেই কনসার্টে ক্লাস ওয়ান থেকে দ্বাদশের শিক্ষার্থীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেই কনসার্টে রক্ত গরম করে যা খুশি তা করা ঠিক নয়!

আমরা কয়েকটা বন্ধু সেদিন মাঠের মাঝখানে উঁচু একটা টেবিলে দাঁড়িয়ে ছিলাম। উঁচু জায়গায় থাকাতে বেশ ভালোভাবেই চারপাশটা দেখতে পাচ্ছিলাম। হঠাৎ করে নজরে পড়লো একদল ছেলে (খুব সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া) গাঁজা খাচ্ছে। তাদের মুখ দেখে মনে হলো তাদের মতো সুখী এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই। তাদেরই একজন একটু পরে আমার এক বন্ধুকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। প্র্যাঙ্ক করছিলো আরকি! ছেলেগুলোর অবস্থা বেগতিক দেখে আমরা বন্ধুরা মিলে তাদের কর্মকান্ড ভিডিও করা শুরু করি। কিছুক্ষণ পর তারা টের পেয়ে গেলে আমাদের কাছে এসে হেভি হুমকি-ধামকি দেয়। সেই চিরপরিচিত হুমকি – “ভিডিও কেউ দেখলে খবর আছে। মনে রাইখো তোমরা মেয়ে!”

কথাটা শুনে রাগে গা কাঁপতে থাকে, আর চিন্তা করি এই আমাদের দেশ? এই দেশের মানুষ? মেয়েদেরকে হ্যারেজ করা তবে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ?

২০১৪ সালে নববর্ষে রমনায় নারী লাঞ্চনার খবর কে না জানে এদেশের! নববর্ষে রমনায় ঘুরতে যাওয়া মেয়েদেরকে ঘিরে ধরে তাদের জামা-কাপড় ধরে টানাটানি, শরীরে হাত দেয়া – এসবকে কী বলব? বাংলা অভিধানে কোনো ভাষা কি আছে একে প্রকাশ করার জন্য? উৎসবের নামে এই যে নরপশুর উল্লাস, তাকে প্রকাশ করার ভাষা আমার জানা নেই। শুধু তাদের জন্য আছে আমার ভেতর একবুক ঘৃণা।

জানি না কত মেয়ে সে’বারের পর আর রমনায় যায় না। কত মেয়েকে মা-বাবা রমনায় যেতে নিষেধ করেছে নববর্ষে। অথচ শূকর-হায়েনারা কিন্তু ঠিকই স্বাধীন! খাঁচায় বন্দী শুধু মানুষেরাই। মনুষ্যত্ব আর পশুত্বের লড়াইয়ে পশুত্বেরই জয় হলো এক্ষেত্রে, যা সবসময় হয়ে এসেছে এই পোড়া দেশে!

এই যে আমাদের উৎসবগুলো – ইদ, পূজা-পার্বন, নববর্ষ – উৎসবগুলো মাটি করে দিতে শুধু একটা অপ্রীতিকর ঘটনাই যথেষ্ট। অথচ আমাদের প্রত্যেকটা উৎসবে এমনটাই হয়ে আসছে। উৎসবের নামে একদল ছেলেপেলে নরপশুর উল্লাস করছে। আশেপাশের সবাই দেখেও দেখছে না, শুনেও শুনছে না। যেদিন নিজের আঁতে ঘা লাগে, সেদিন সে চিৎকার করে, প্রতিবাদ করে। কিন্তু একা একা কী করে পারবে একদল বুনো শূকরের বিরুদ্ধে? পারার কথা না। পারেও না। একসময় সব নিশ্চুপ হয়ে যায়। আবার কারল না কারো আঁতে ঘা লাগে। এভাবে চলতেই থাকে।

সবাই জানে ওরা সম্মিলিত, তাই ওরা শক্তিশালী। আমি ওদের সঙ্গে পারবো না। কিন্তু আমরা তো পারব! ওরা আর কতজন, ৫০-৭০ বড়জোর ১০০! কিন্তু আমাদের সংখ্যাও কি কম? আমরা যারা মনে মনে ভাবছি অন্যায়ের প্রতিবাদ কেউ করুক, সেই সংখ্যাটা কি ওদের চেয়ে অনেক বেশি নয়? শুধু আমরা অনেকে থেকেও একা, আর ওরা কম হয়েও সম্মিলিত – এটাই পার্থক্য।

যদি আজকে একটি উৎসবে আমরা এইসব গ্যাংকে উৎসবটা ভন্ডুল করে দেয়ার সুযোগ না দিই, তবে আগামীকাল ব্যাপারটা অনেক কমে যাবে। জানি না কেন এখনও করছি না। কবে বুঝবো আমরা? যেদিন নিজের সাথে কোনো দূর্ঘটনা ঘটবে সেদিন?

মানুষই কিন্তু একমাত্র প্রাণী যে অন্যকে দেখে শিক্ষা নিতে পারে। একজন মানুষ ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়লে আরেকজন তাকে দেখেই শিখে নেয় ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়লে কী হয়, নিজে লাফ দিয়ে দেখতে যায় না। অথচ আমরা বারংবার ঝাঁপ দিচ্ছি! এতজনকে দেখেও শিক্ষা হচ্ছে না যে এই সময় চুপ থাকার নয়, এই সময় আওয়াজ তোলার! প্রতিটা ছোট-বড় অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের আওয়াজ তুলতে হবে। “এটা আমার সমস্যা না” ভেবে কেটে পড়তেই পারি, কিন্তু তা করা মানে সমস্যাটা নিজের গলায় যত্ন করে ঝুলিয়ে বাসায় নিয়ে আসা। আগামীকাল সমস্যাটা আমার গলাতেই ফাঁস পরাবে।

এই সুযোগ সন্ধানীর দল নিজে থেকে থামবে বলে মনে হয় না। এরা প্রতিটি ভিড়ে, উৎসব-অনুষ্ঠানে আনন্দের নাম করে সুযোগ খুঁজতেই থাকবে। আর এভাবে চলার মানে হলো আমরাও তাদেরকে সুযোগ দিতেই থাকবো! কিন্তু তা কী করে হয়? এমন করে চললে হয় দেশ ছেড়ে পালাতে হবে, নয়তো কোনো উৎসব পালন করাই বন্ধ করে দিতে হবে! কোনোটাই যেহেতু সম্ভব নয়, চলুন তাহলে একটু প্রতিবাদ করি। কাজটা কিন্তু কঠিন নয়; শুধু প্রয়োজন অল্প একটু সাহস আর সম্মিলিত হওয়া। তাহলে আমরাই পারব পুরনো উৎসবের আমেজকে ফিরিয়ে আনতে। একটু চেষ্টা করে দেখি না কী হয়!

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।