প্রচ্ছদ » খেলাধুলা » তোমার একত্রিশ শুভ হোক, মেসি!

তোমার একত্রিশ শুভ হোক, মেসি!

প্রকাশ : ২৪ জুন ২০১৮১০:০৩:২৯ অপরাহ্ন

খাতুনে জান্নাত | বাংলা ইনিশিয়েটর

সে দাঁড়িয়ে ছিল মাথা নিচু করে। চুপচাপ, শান্তভাবে। যেন আর কিছুই করার নেই। মনে হচ্ছিলো একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র বুঝি হুট করে ম্লান হয়ে গেল। কিন্তু নক্ষত্রকে ম্লান হলে চলবে কী করে? নক্ষত্রকে তো সবসময় আলোকিত হয়ে থাকতে হবে। কারণ নক্ষত্রের ওপর ভর করে বেঁচে থাকে আশেপাশের সকল কিছু! সেই নক্ষত্র দীপ্তি না ছড়ালে চলবে কী করে? নক্ষত্রকে আলো ছড়াতে হবে; যতটা নিজের জন্য, তারচেয়ে অনেক বেশি অন্যদের জন্য!

এই নক্ষত্র কিন্তু রাতের আকাশে দেখা পাওয়া বহুদূরের নক্ষত্র নয়। এই নক্ষত্রের জন্ম মাটির পৃথিবীতে। কিন্তু আকাশের সেসব নক্ষত্র আর মাটির নক্ষত্রের মধ্যে মিল হলো দুটোই আলো ছড়িয়ে যায় অনবরত, নিজের আলোয় উজ্জ্বল করে তোলে চারপাশ। এই নক্ষত্রের নাম – লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিত্তিনি, আমাদের মেসি!

আজ ৩১ – এ পা রাখা বার্সেলোনার হয়ে খেলা এই আর্জেন্টাইন তারকা ফুটবলারকে নিয়ে সারা পৃথিবীর উন্মাদনার শেষ নেই। তাকে বলা হয় সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের একজন। হবে নাই বা কেন? পাঁচবারের ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড় হওয়া ছাড়াও বার্সেলোনা এবং আর্জেন্টিনার হয়ে আছে তার অসংখ্য পুরস্কার। ২০১১–১২ মৌসুমে সব ধরণের প্রতিযোগিতায় ৯৬টি গোল করার মাধ্যমে ইউরোপীয় ফুটবলে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোল করার রেকর্ড গড়েন মেসি। ২০১২ খ্রিস্টাব্দের মার্চে চ্যাম্পিয়নস লীগে বেয়ার লেভারকুজেনের বিপক্ষে খেলায় পাঁচ গোল করে মেসি ইতিহাস গড়েন। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের ৩০ মার্চ মেসি লা লিগায় টানা ১৯টি খেলায় গোল করার কৃতিত্ব অর্জন করেন। এর মধ্য দিয়ে ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে লীগের সব কয়টি দলের বিপক্ষে টানা গোল করার রেকর্ড গড়েন তিনি। ২০১৪ সালে তিনি লা লিগার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার খেতাব অর্জন করেন। ২০১৫ সালে তিনি বার্সেলোনার হয়ে তার ৫০০ তম গোল করেন। এছাড়া মেসি প্রথম এবং একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে টানা চারটি চ্যাম্পিয়নস লীগে সর্বোচ্চ গোল করেছেন।

মেসি আর্জেন্টিনাকে ২০০৫ ফিফা অনূর্ধ্ব ২০ বিশ্বকাপ জয়ে সাহায্য করেন। প্রতিযোগিতায় তিনি সর্বোচ্চ ছয়টি গোল করেন এবং সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে আর্জেন্টিনার সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে তিনি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেন। ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনা রানার-আপ হয় এবং তিনি প্রতিযোগিতার কনিষ্ঠ সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে বেইজিং অলিম্পিকে আর্জেন্টিনা অলিম্পিক ফুটবল দলের হয়ে মেসি স্বর্ণপদক জিতে নেন। এটিই ছিল তাঁর প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মাননা। ২০১৪ বিশ্বকাপে তিনি আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দেন। তিনি টানা চার খেলায় সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার অর্জন করেন এবং দলকে ফাইনালে নিয়ে যান। প্রতিযোগিতার সেরা খেলোয়াড় হিসাবে তিনি গোল্ডেন বলের পুরস্কারও জিতেন। খেলার ধরন এবং দৈহিক গঠনের কারণে তাকে তারই স্বদেশী দিয়েগো মারাদোনার সাথে তুলনা করা হয় যিনি নিজেই মেসিকে স্বীয় ‘‘উত্তরসূরি’’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। দেশ ও ক্লাবের হয়ে বর্তমানে তার ৬০০ টির বেশি গোল রয়েছে।

এসব কিছু ছাড়াও মেসির আছে আরও অসংখ্য রেকর্ড এবং পুরস্কার। তারপরেও নিজের দেশের মানুষের কাছে তার তেমন কোনো দাম নেই। কেন? কারণ লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে ফুটবল বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়াকেই সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হিসেবে দেখা হয়। মেসি নীল-সাদা জার্সি গায়ে না বিশ্বকাপ জিততে পেরেছেন, আর না কোপা আমেরিকা! তাই তাকে ম্যারাডোনার সাথে তুলনা করা তো দূরের কথা, তাকে বেশ অপছন্দই করছে এখন তার দেশের মানুষ! ম্যারাডোনার প্রতি তার দেশের মানুষের যে সম্মান, শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা, মেসির জন্য তার দু’আনাও নেই!

এবার বিশ্বকাপে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে মেসির পেনাল্টি মিস নিশ্চিত জয়ের হাত থেকে তাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এছাড়া ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার শোচনীয় পরাজয়ের জন্যেও তাকে দায়ী করা হচ্ছে। তার মতো তারকা খেলোয়াড়ের জ্বলে না ওঠাকে মেনে নিতে পারছে না তার দেশের মানুষ। আর্জেন্টিনার সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, খেলার সময় তিনি ‘খাম্বার’ মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন! তার এখনই অবসর নেয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেছে কোনো কোনো সংবাদ মাধ্যম! তাদের মতে, দেশের জন্য মেসি তেমন কিছুই করে নি, যেমন ম্যারাডোনা করেছেন। দেশকে মেসির আর কিছু দেয়ার নেই। বার্সেলোনার জন্য অনেক কিছু করলেও দেশ তার থেকে কিছুই পায় নি!

ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ হারার পর মেসির স্ত্রীকেও সইতে হয়েছে বিভিন্ন কটুক্তি। মেসির স্ত্রী তার ছোট ছেলেকে নিয়ে ইন্সটাগ্রামে একটি ছবি পোস্ট করেন যেখানে লেখা থাকে, “ভামোস পাপা” অর্থাৎ এগিয়ে যাও বাবা। সেখানে বেশ বাজে মন্তব্য করেছেন সে দেশের মানুষ!

আসলেই কি মেসির দেশকে কিছুই দেয়ার নেই? গতবার কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে যাওয়ার পর মেসির অবসরের সিদ্ধান্তে তবে কেন তাকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলো সে দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত? যখন মেসি দু’হাত ভরে দিয়েছে, সবাই শুধু গ্রহণ করেছে। আজ তার খারাপ দিনে কি তার দেশের মানুষের তার পাশে দাঁড়ানো উচিত নয়?

মাথা নিচু করে যেদিন মেসিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি, সহ্য করতে পারি নি। মেসিকে এটা মানায় না। একটি মানুষ নিজের সর্বস্ব দিয় সকল অর্জন করেও শুধুমাত্র একটা সোনালি কাপ না পাওয়ার আক্ষেপে শেষ হয়ে যাচ্ছে, এটা সহ্য করতে পারছে না কোনো ফুটবলপ্রেমীই! কটুক্তি কিছু কম হচ্ছে না মেসিকে নিয়ে, দোষারোপ করা হচ্ছে তাকে। তবে তার পাশেও আছে সারা পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ! মেসি গ্রেট; সেটা বিশ্বকাপ জিতলেও, না জিতলেও। তবে জিতলে তার জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপটা দূর হবে, এই যা পার্থক্য! তবে ভক্তদের মনে কিন্তু তিনি প্রথম সারিতেই থাকবেন!

তাঁকে কখনো কাঁদতে দেখি নি। ২০১৪ সালে ফাইনালে স্বপ্নের দুয়ার থেকে যখন ফিরে এসেছিলেন, তখনও না। শুধু দাঁড়িয়ে ছিলেন মনমরা হয়ে। সেই না কান্না করার দৃশ্য কান্না করার চেয়েজ ভয়াবহ! ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা জার্মানি – যে দলের সাপোর্টারই হোক না কেন, কেউই মেসির মাথা নিচু দেখতে চায় না! আমি চাই মেসি কাঁদুক, আনন্দের কান্না কাঁদুক! তার স্বপ্ন পূরণের কান্না কাঁদুক! কাঁদাক তার সকল ভক্তকে!

শুভ জন্মদিন মেসি! তোমার একত্রিশ শুভ হোক, তোমার স্বপ্ন পূরণ হোক! শুধু হতাশ হয়ো না। সারা পৃথিবী যার সাথে আছে, তার এত হতাশা কিসের?

বাংলা ইনিশিয়েটরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।